আমার বন্ধু কল্পনা

আমার বন্ধু কল্পনা

খায়রুননেসা রিমি--

--আমেনা খাতুন কল্পনা,আমার স্কুল জীবনের বন্ধু।পড়তাম শরিয়তপুর গার্লসে।সে সময় আমার লেখার যে কয়জন ভক্ত পাঠক ছিল কল্পনা ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম।আমি কবে,কখন কোন কবিতা লিখলাম সবার আগে সেটা কল্পনার জানা চাই।আমার বন্ধুদের মধ্যে কল্পনা ছিল বেশ সুন্দরী ।যার কারণে সে সময় ভালো পাত্র পাওয়াতে অনেকটা হুট করে কল্পনার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ওরই সবার আগে বিয়ে হয়।ওর বিয়ের দিন ও আমাদের সবাইকে দাওয়াত করেছিল।
সেদিন ছিল ২২ মার্চ,১৯৯০ সাল। আমরা সব বন্ধুরা দল ধরে বেলা ১২ টার মধ্যে ওর বাসায় পৌছে গেলাম।সবাই বিয়ের দিন ওকে নিয়ে ব্যস্ত।আর কল্পনা ব্যস্ত আমাকে নিয়ে।আমি যাওয়ার সাথে সাথে সে আমার হাতে একটা খাতা ও কলম ধরিয়ে দিয়ে  আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেলো ওদের পুকুর পাড়ে।আমি জিজ্ঞেস করলাম, 
ঃকিরে কি হয়েছে?
ঃকিছুই হয়নি।
ঃ তাহলে আমাকে সবার সামনে থেকে এইভাবে ধরে নিয়ে এলি কেন?আমি কি কিছু করেছি?আমার অপরাধ কী?
কল্পনা মুখে আরেকটু সিরিয়াস ভাব এনে বললো,
ঃহুম তুই অনেক বড় কিছু করেছিস। তোর অপরাধ তুই এত সুন্দর কবিতা লিখিস কেন?তুই জানিস না আমি তোর  কবিতার ভক্ত।আজকে আমার বিয়ে।বিয়ের পরে তোদের সাথে আবার কবে না কবে দেখা হবে তাই আমার বিয়ে উপলক্ষে তোর লেখা একটা কবিতা আমাকে তুই উপহার দিবি।এই নে খাতা ও কলম।আমাদের এই পুকুর পাড়ের মনোরম দৃশ্য দেখবি আর চমৎকার একটা কবিতা লিখে আমাকে উপহার দিবি।ওটা আমি তোর স্মৃতি হিসেবে  সারাজীবন যত্ন করে রেখে দিব।
এর মধ্যে কল্পনার ডাক পড়ে গেলো।বরপক্ষ এসে গেছে। তাড়াতাড়ি বিয়ের কনেকে সাজাতে হবে।কল্পনা দৌড়ে গিয়ে কনের আসনে বসলো।আমার অন্য বন্ধুরা ওকে সাজাতে লাগলো আর হাসি তামাসা করতে লাগলো।
আমি পুকুর পাড়ে একা একা বসে কবিতা বানাতে লাগলাম।পুকুর পাড়ের আশপাশের গাছ গাছালি ও সবুজ প্রকৃতি দেখে আমার মন ভরে গেলো।ঐ প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে সেদিন একটা কবিতা লিখে কল্পনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। তারপর বিয়ে খেয়ে আমরা চলে আসি। কল্পনা চলে যায় শ্বশুর বাড়ি।বিয়ের পরে আর কল্পনার সাথে আমাদের খুব একটা দেখা হতো না।এরপর আমরা এস এস সি পাশ করলাম।কলেজে উঠলাম।আমরা ব্যস্ত হয়ে গেলাম লেখাপড়া নিয়ে।আর কল্পনা ব্যস্ত হয়ে গেলো ওর ঘর সংসার নিয়ে।তারপর আমারও বিয়ে হয়ে গেলো।আমিও ঘর সংসার, পড়াশুনা,সন্তান,চাকরি,লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।ভুলে গেলাম আমাদের ফেলে আসা সোনালি কৈশোরকে।
হঠাৎ মাস তিনেক আগে দেখলাম একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো।নাম আমেনা খাতুন কল্পনা।নামটা দেখার সাথে সাথে আমার মন কেমন করে উঠলো।কিছু সময়ের জন্য ফিরে গেলাম আমার সোনালি কৈশোরে।না জেনে না চিনে শুধুমাত্র আমেনা খাতুন কল্পনা নাম দেখেই এড করে নিলাম তাকে।আমি সাধারণত যাচাই বাছাই ছাড়া কাউকে এড করি না।অথচ আজ কিছু না ভেবেই এড করে নিলাম।একটা নামের কত ক্ষমতা!
এড করার সাথে সাথেই একটা ফোন এলো,
মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে এলো আমেনা খাতুন কল্পনা নামটা।নাম দেখেই কেন যেন মনে হলো, এটা আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধু কল্পনাই হবে।ফোন রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন বলে উঠলো,
ঃআপনি কি খায়রুননেসা রিমি।
ঃজি
ঃআপনি কি শরীয়তপুরে কল্পনা নামে কাউকে চিনতেন?
ঃহুম,চিনতাম।তার পুরো নাম ছিল আমেনা খাতুন কল্পনা। 
ঃআমিই সেই আমেনা খাতুন কল্পনা।কেমন আছেন আপনি?
ঃভালো আছি।তুই কেমন আছিস?কত বছর তোকে দেখি না।
ঃআমিও তোমারে অনেক খুঁজছি। তোমার  ঠিকানা জানার জন্য কত জনের কাছে খোঁজ করেছি।তারপর লিপির কাছ থেকে তোমার এফ বি আইডি নিয়ে আজই রিকো পাঠালাম।আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে তুমি এত দিনেও আমার নামটা মনে রাখছো!
ঃতোর নামটা আমার কলিজায় গাঁথা।আমি তোকে ভুলব কি করে?
ঃ আমিও তোকে ভুলতে পারিনি। আমার বিয়ে উপলক্ষে আমাকে নিয়ে লেখা তোর সেই কবিতাটা আজ ৩০ বছর ধরে আমি যত্ন করে রেখেছি। তাহলে ভেবে দেখ আমিও তোকে কতটা ভালোবাসি।ফোনে কথা শেষ হলে কল্পনা ৩০ বছর আগে আমার লেখা কবিতাটা ইনবক্স করে।কবিতা দেখে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম।কি করে পারলো সে এত বছর ধরে আমার অপরিপক্ক কাঁচা হাতের একটা কবিতা যত্ন করে রাখতে।ভালোবাসা বুঝি একেই বলে।সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনও হারিয়ে যায় না।বন্ধুত্বের জয় হোক।সবাইকে বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।