এমন সাদেক সাহেব আর পাব না

এমন সাদেক সাহেব আর পাব না
   - গোলাম রববানী
--মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো করে বলতে চাই-
সেই ধন্য নরকুলে
লোকে যারে নাহি ভুলে
প্রয়াত শিক্ষামন্ত্রী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত এ এস এইচকে সাদেক সাহেবের ১৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।এইদিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি যশোর-০৬ আসনের নয়নের মণি'কে।যে আজ আর নেই,অনন্তের পথে শেষযাত্রায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ২০০৭ সালের আজকের এই দিনে।তবুও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে। তাঁর মতন মহান ব্যক্তিকে  স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধাভরে। 
এ এস এইচকে সাদেক নামেই বেশি পরিচিত। তবে যশোর-০৬ আসনে সাদেক সাহেব নামেই সমধিক পরিমাণে পরিচিত ছিলেন।আসলে তাঁর প্রকৃত নাম আবু শারাফ হিজবুল কাদের সাদেক। মাত্র তিয়াত্তর বছর জীবদ্দশায় বিচিত্র ক্ষেত্রে পদচারণা ছিল এই বিস্ময়কর মেধাবী নক্ষত্রের। তিনি ১৯৩৪ সালের ৩০ এপ্রিল যশোরের কেশবপুর উলজেলার বড়েঙ্গা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা ইয়াহিয়া সাদেক ছিলেন যুগ্ম কমিশনার। সাদেক সাহেব মাত্র ষোল বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন, আঠারো বছর বয়সে ইন্টারমিডিয়েট এবং বাইশ বছর বয়সে অর্থনীতিতে স্নাতক পাস করেন।পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও শাসনতন্ত্র বিষয়ে পড়াশুনা করেন।
স্নাতক সম্পন্ন করেই মাত্র বাইশ বছর বয়সে সিপিএসে ক্যাডারে যোগ দান করেন।নির্দ্বিধায় বলা যায়- তিনি অসম্ভব রকমের মেধাবী ছাত্র ছিলেন শিক্ষাজীবনে।সিপিএস ক্যাডারে যোগদান করে নীলফামারী ও নারায়ণগঞ্জ মহকুমা এবং কুমিল্লা ডিপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়কালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সচিব পদে নিযুক্ত ছিলেন।তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সচিব ছিলেন এবং ১৯৭২ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি তাঁর মূখ্য সচিব ছিলেন।
সরকারি চাকরি জীবনে তিনি শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।তাছাড়া নিপার পরিচালক পদেও চাকরি করেন। তাঁর বহুমুখী কর্মের মধ্যে অন্যতম তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে কাজও করেন।একটা সময় সাদেক সাহেব স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসরে যান। যখন চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তখন এ অনন্য প্রতিভাবান ব্যক্তির বয়স মাত্র আটান্ন বছর। 
চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের পর সাদেক সাহেব আটান্ন বছর বয়সে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়তার সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যান।সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে যশোর-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মন্ত্রিপরিষদে সদস্য হিসেবে শপথ নেন সেই বছরের ২৩ জুন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী হন।তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে ২০০১ সালে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে জাতীয় সাংসদ নির্বাচিত হন।তখন তিনি সরকারি হিসাব ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।
সাদেক সাহেব বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলা এবং রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জনে কৃতিত্ব রেখেছেন।
সাদেক সাহেব রেখে গেছেন তাঁর সহধর্মিণীসহ  দুই সন্তান এবং প্রচুর শুভাকাঙ্ক্ষীকে।তাঁর স্ত্রী জনাবা ইসমাত আরা সাদেক স্বামীর মত দুই বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তাঁর অর্ধাঙ্গিনীও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।২০২০ সালের জানুয়ারিতে তিনি পরলোকগমন করেন।তাঁর তনয় তানভীর সাদেক কম্পিউটার প্রকৌশলী এবং তনয়া নওরীন সাদেক একজন স্থপতি। 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতন সাদেক সাহেবকেও ফুটবল খেলা খুব পছন্দ করতেন।সাদেক সাহেব কৈশোরে খুব ফুটবল খেলতেন।শুনেছি বঙ্গবন্ধুর সাথে সাদেক সাহেবের ভালো সম্পর্ক ছিল।এ এস এইচ কে সাদেক মহোদয় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের  চেতনাকে ধারণ করে রাজনীতি করেছেন। 
চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন -' মানুষ তার স্বপ্নের  সমান বড়'।  আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা সাদেক মহোদয় স্বপ্ন দেখেছিলেন সাধারণ মানুষকে নিয়ে। সেই স্বপ্নকে তিনি বাস্তবায়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।তিনি শুধু যশোর-০৬ আসনের নের্তৃত্ব দেননি, তিনি নের্তৃত্ব দিয়েছেন সারা বাংলাদেশের। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার পরমপুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন বাংলা  সাহিত্যেকে মহিমান্বিত গৌরবান্বিত করেছেন, তেমনি সাদেক সাহেবও বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারের শীর্ষ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। 
এ পৃথিবীতে মানুষ আসে মানুষ চলে যায়। কিন্তু সকল মানুষ  মানুষ নই, কিছু মানুষ আসলেই মানুষ। তাঁদের মধ্যে সাদেক সাহেব ছিলেন এক অমূল্য মানুষ। তিনি মানুষকে ভালোবেসেছেন।ভালোবাসাও তিনি পেয়েছেন।মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করেছেন গেছেন আজন্ম।তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপদ বাসস্থান তথা জন  নিরাপত্তার জন্য কাজ করে গেছেন।সাবেক এ শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার জন্য আকাশছোঁয়া কাজ করেছেন। যার ছোঁয়া এখন কেশবপুরবাসীসহ সমগ্র বাংলাদেশ পাচ্ছে। বাস্তব দৃষ্টান্ত ৩৮ তম বিসিএসে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের ক্যাডারে এবার দেড় ডজন মতন সরকারি চৌকস কর্মকর্তা পেয়েছে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শুধুমাত্র  এই কেশবপুর থেকেই।শিক্ষা সংস্কৃতির অভয়াশ্রম সাদেক সাহেবের গড়া কেশবপুর এখন শতভাগে বিদ্যুতায়নের একটি উপজেলা।তিনি জনগণের জন্য করেছেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা।সাদেক সাহেব বেঁচে থাকলে হয়তো কেশবপুরবাসীর জন্য মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে যেতে পারতেন। কারণ তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ।তাঁর অবর্তমানে যারা এখন আছেন তাঁরা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে কেশবপুরবাসীর প্রাণের দাবী একটি সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে।যেটি প্রতিষ্ঠিত হলে স্বদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য শিক্ষাপিপাসু সুযোগ ভোগ করতে পারবে।
সাদেক সাহেব দল মত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষকে আপন করেছিলেন।যশোরের কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রান ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক  সুকান্ত বিশ্বাস বাবু'র কাছ থেকে জানতে পারলাম সাদেক সাহেব তাঁর দলের রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের প্রচুর স্নেহ করতেন এবং খুব ভালোবাসতে। সুকান্ত বিশ্বাসের ভাষ্য মতে আদর করে সাদেক সাহেব তাকে  'শ্লোগান মাষ্টার' বলে ডাকতেন।সত্যিই নেতা হিসেবে সাদেক সাহেব অমায়িক ছিলেন। যাকে বলা হয় এটিকেট। নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন এক পরমপুরুষ।তিনি অন্যায়কে কখনোই প্রশ্রয় দেননি।অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করেননি।সত্যকে খুব ভালোবাসতেন।
কেশবপুরবাসীর জন্য যত কল্যাণমূলক কার্য সাধিত হয়েছে  প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ছোঁয়া রয়েছে -যা কেশবপুরবাসী এখন অকপটে স্বীকার করবে। বন্যা কবলিত কেশবপুরবাসীর জন্য তিনি ভেবেছিলেন তাদের কষ্টটা লাঘবের ব্যাপারে।তিনি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছেন, কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছেন।এক কথায় বলতে গেলে তিনি তিনি আধুনিক কেশবপুরের স্রষ্টা। 
বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে - তখন তিঁনিও সার্বিকভাবে কেশবপুর তথা সোনার বাংলার অগ্রযাত্রায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। ঠিক সেই সময়েই আমাদের সবার আশা আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে! তাঁর অবর্তমানে আমরা একবিশাল শূন্যতা অনুভব করি৷ তবুও আমরা আশা বেঁধে রাখি তিনি আজও কেশবপুরবাসীসহ বিশ্ববাসীর কাছে একটি ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের মতন আলো ছড়াচ্ছেন। কবিতার সুরে বলতে পারি- 
হে মহান নেতা 
সাদেক সাহেব 
তুমি  রবে হৃদয়ে 
অনন্তকাল ধরে
অনাগত শিশুর চোখে
সদ্য ফোটা গোলাপ ফুলে!
কোটি কোটি তারকার ভিড়ে
আলোকিত এক চাঁদ হয়ে!
সেই দিনের সেই স্লোগান 
কণ্ঠে আনে আগমনী গান
সাদেক সাহবের দুই নয়ন
কেশবপুরের উন্নয়ন
আজকের এই হৃদয় ক্ষরণ দিনে বহুমুখী প্রতিভাবান নেতাকে  জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।  আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এই কামনা করি।
 কেশবপুর, যশোর।