কয়েক দফা ধর্ষণ ও একাধিকবার জোরপূর্বক গর্ভপাত, আইএসের নৃশংসতার বিবরণে তরুণী

কয়েক দফা ধর্ষণ ও একাধিকবার জোরপূর্বক গর্ভপাত, আইএসের নৃশংসতার বিবরণে তরুণী

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
লায়লা তালু কখনোই ভাবতে পারেননি যে, তার প্রতিবেশী প্রতারণা করবে। উত্তর ইরাকের সিনজার জেলায় তার বাড়ির আশপাশের গ্রামবাসীরা যখন তাদের ছেড়ে গেলো, তখন তার পরিবারও সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয়। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল সাতটায় লায়লা তার স্বামী মারওয়ান খলিল এবং তাদের ৪ মাস ও ১৮ মাস বয়সী দুই বাচ্চা নিয়ে ১০ হাজার ইয়াজিদির মতো পালালেন। তিনি ভেবেছিলেন যে তারা সিনজার পাহাড়ে আশ্রয় পেতে যাচ্ছেন।

কিন্তু ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই তাদের ভুল ভেঙে যায়। ইরাকের আইএস জঙ্গিরা পুরো শহর এবং এর আশপাশের গ্রাম ঘিরে ফেলে। লায়লার পরিবার আর ডজন খানেক ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষকে আইএসের জঙ্গিরা রাস্তায় নিয়ে আসে। কিন্তু তারা এই জঙ্গিদের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল।

জঙ্গিরা ছেলেদেরকে, নারী এবং শিশুদের থেকে আলাদা করে। সেদিন সন্ধ্যায় লায়লা এবং তার সন্তানদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মসুলের বাজ জেলায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের চার দিন আটকে রাখা হয়। এরপর বাদুস কারাগারে যৌথ বাহিনীর বোমা হামলার কারণে এক সপ্তাহ পর পুনরায় তাল আফারের একটি স্কুলে এনে রাখা হয়। সেখানে থাকাকালীন নারী এবং শিশুদের শারীরিক নির্যাতন, মেরে ফেলার হুমকি, অনাহারে রাখা ও তিরস্কার করে আইএস বাহিনী। এর আটমাস পর নারী ও শিশুদের অনেকেই যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন আইএসের শক্ত ঘাঁটি সিরিয়ার রাকা শহরে লায়লা ও সন্তানদের নিয়ে আসা হয়।

লায়লা জানান, অন্য একশত ইয়াজিদি নারীর সাথে বড় একটি বাসে করে তাকে ও তার সন্তানদের রাকা শহরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে আমার ও সন্তানদের সাথে ভেড়া ও অন্যান্য পশুর মতো ব্যবহার করে আইএস বাহিনী। আমাদের পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয় দেয়া হতো না। আমাদের মেঝেতে ঘুমাতে হতো। প্রতি তিন বেলা খাবারের সাথে বেদম মারপিট করা হতো।  

লায়লা তার সন্তানদের সাথে নিয়ে এভাবেই ৪০ দিন একটি কক্ষে বন্দী থাকেন। এরপর রাকা শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তাদের নিয়ে আসা হয়, যে অ্যাপার্টমেন্টটিতে মূলত আইএসের সিনিয়র নেতারা থাকতেন। 
 
লায়লা জানান, পরের ঘটনা আরও ভয়াবহ ও নৃশংস। সবুজ চোখ, বড় চুল ও ভরাট চেহারার আনুমানিক ৪০ বছরের একজন ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে অস্বীকার করায় তাকে বেঁধে ফেলে। এরপর চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করে এবং ধর্ষণ করে।

লায়লা আরও জানান, এরপর মসুল থেকে আসা কালো চোখধারী ৩০ বছর বয়স্ক একজন ব্যক্তির  কাছে তাকে বিক্রি করে দেয়া হয়। তার হাতে কয়েকদফায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয় তাকে। এরপর যে ব্যক্তি তাকে কিনে নেয়, তিনি ছিলেন বাগদাদের। এক সময় গর্ভবতী হয়ে পড়েন লায়লা। বাধ্য করা হয় গর্ভপাতে।

লায়লা বলেন, তারা আমাদের “স্প্যাগেটি’’ বলে সম্বোধন করতো  এবং বলতো, তোমাদের মৃত্যু ছাড়া কোনও অধিকার নেই। আমাদের দাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী সময়ে সৌদি  আরবের একজন নাগরিক লায়লাকে ধর্ষণ করেন। এবার গর্ভবতী হয়ে পড়লে আবারও জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় তাকে। চরমভাবে অত্যাচারিত হওয়ার সেই দিনগুলোতে একটি ছোট কক্ষে দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতে হয়। পুরোপুরি বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থার সে দিনগুলোতে লায়লা জানতো না, কোথায় রয়েছে তার স্বামী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা।
 
এরপরের সময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয় ৩৩ বছরের লেবানীজের সাথে। এমনকি কখনো কখনো তার ডেনমার্কের স্ত্রীও তার স্বামীর ধর্ষণকাজে সহোযোগিতা করতো। লেবানিজ সেই ব্যক্তি যখন ধর্ষণ করতো, তখন আরও অনেকেই তার সাথে নিয়মিত আসতো।

রাকায় দুই বছর থাকার পর ২০ হাজার ডলারের বিনিময়ে সিরিয়ার চোরাচালানকারী এবং লায়লার পরিবারের সমঝোতায় মুক্ত হয় লায়লা ও তার সন্তানেরা। মুক্ত হয়ে রাকায় অবস্থানকালীন সময়ে নোটবুকে লিখিত দিনলিপি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন লায়লা তালু। সে সময়কার তার সাথে ও ইয়াজিদি নারীদের সাথে ঘটে যাওয়া ভীতিকর কিছু অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা নোটবুকে লিখে রাখেন লায়লা।

যদিও এ কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। লায়লার শঙ্কা ছিল, যার হাতে তিনি বন্দী আছেন, তিনি যদি এসব দেখে ফেলেন, তাহলে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। লায়লার মতে, তার আগে আরও অনেক নারী এখানে এসে তার চেয়েও বেশি অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সেটি পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো দরকার। তার আশা, তাদের সাথে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতার রেকর্ড সংরক্ষিত রাখার মধ্য দিয়ে নির্যাতিতরা ন্যায়বিচার পাবেন।

লায়লা আশা করছেন, এ ঘটনা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে অন্য নারীরা উপকৃত হবেন। সেই সাথে এমন ঘটনার মুখোমুখি হওয়া থেকে তাদের রক্ষা করবে। একদিন তার সাথে এবং অন্য নারীদের সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার দালিলিক প্রমাণ দিতে সক্ষম হবেন। এমন আশায় বুক বাঁধছেন লায়লা। লায়লা বর্তমানে উত্তর ইরাকে ডাউক প্রদেশে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

সূত্র: আল জাজিরা