ত্রিশে রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য

ত্রিশে রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য

উদয় শংকর দুর্জয়

---তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন,
অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন।’
(শেষের কবিতা, ১৯২৮)
বিদায় নয়, এ একপ্রকার দৃঢ় প্রত্যাগমন। এই অন্তিম আগমনের মধ্য দিয়েই সারা বিশ্ব সংসারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরঅমর হয়ে আছেন। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের শেষাংশে এমনই এক বিদায়ের মোহন বাঁশি তিনি বাজিয়েছিলেন তা যেন আজও পাঠক-ভক্তবৃন্দকে এক জাদুর বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। তিনি ভেবেছেন রথের আগামনী বেগের চঞ্চল হাওয়ায় উড়ে যাবে সেই পুরনো নাম, যে নামের সাথে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিবিড় যোগ রয়েছে। পুরনো ঠিকানা, যে ঠিকানায় আবার বেহালা বাজবে অমিয় সুরে। আবার আকাশ বিদীর্ণ করে আগন্তুকের মতো বর্ষণবাণী ছড়িয়ে দেবে শীতল কামনার ছায়ায়। প্রদীপের পাদদেশের ছায়া সরে গিয়ে দক্ষিণের জানালায় জ্বলে উঠবে বিচ্ছেদের হোমবহ্নি। সেদিন ধুলোর স্নান সেরে এই বৃক্ষ ও প্রান্তর হয়ে উঠবে ভয়হীন প্রার্থনার উজ্জ্বল মানসভূমি। হোক সন্ধ্যে বেলা, কি সাঁঝ পেরুনো বেলা! ধূপময় সুগন্ধীর ভৈরবী রাগে উপছে পড়বে তৃষ্ণার জল এই সরোবরে। যেখানে অগণিত ভক্তকুল মন্ত্রযজ্ঞে জপে যাবে অমর সৃষ্টি গীতবিতানের রাগানুরাগের সুর।
মৃন্ময়ীর সুগন্ধী ছড়িয়ে তিনি আজও আছেন মানব হৃদয়ের অন্তরীক্ষে। ঝরা বকুল অথবা ঝরা শিউলি, শরতের শিশির চুরি করে যেদিন গোপনে আবার চোখ মেলে তাকাবে সেদিন বুঝে নিও। তিনি আছেন কী কবিতায়, কী গীতবিতানে, কী ছোটগল্পে, কী উপন্যাসে, কী নাটকে। জীব সম্প্রদায় যেমন বেঁচে আছে অক্সি-অঞ্জলির মায়ায় তেমনি তাঁর সৃষ্টির কাছে অবিরল ধারায় ছুটে আসছে শত বছরেরও অধিক সময় ধরে কালের কাছে রেখে যাওয়া কর্মের রামধনু। তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর আধ্যাত্মিক প্রেম, চিহ্ন এঁকে গিয়েছেন মাধবী লতার, সুগন্ধী ছড়িয়ে গেছেন ভক্তদের চৌকাঠে। নকশা করা দরজায় ফুটে উঠেছে তাঁরই নামের আলপনা। কবি নিজেই অনুরোধ করেছেন আমার জন্য শোক করো না, দুঃখের প্রহরগুলোকে নিজের হাতে জড়িয়ে নিয়ো না। বিনাশের হাত দিয়ে সে-রোদন ধারাকে দুপাশে সরিয়ে দিয়ে সাঁতার কেটে এগিয়ে যাও। হ্যাঁ তবে যদি কেউ বুকের ভেতর উৎকণ্ঠার সেতার জাগিয়ে সেই মধুক্ষণ, সেই মহেন্দ্রযোগের জন্য অপেক্ষা করে তবে কবিগুরু ধন্য হবেন। এমন মনস্তাপ তিনি রেখে গেছেন তাঁর কবিতার মর্ম বীণায়, অক্ষরের শিরা মধ্যশিরায়।
১৯২৮ সালে ব্যাঙ্গালোরের বেলাব্রুয়ির ভবনে বসে কবিগুরু তাঁর অমর সৃষ্টির মাঝে লিখে গেছেন উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’; এবং তা প্রকাশ পায় একই বছরের ২৫ শে জুনে। বিংশ শতাব্দির তৃতীত দশক এবং তার পরবর্তী সময়কাল বাংলার সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার এক নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে তখন। আধুনিকতার নব্যপালে হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। কবিতার জয়োল্লাসের রথে চড়ে কবিরা সব নিয়ম ভেঙেচুরে এক নতুন উদ্যান সাজিয়ে চলেছেন। এক দিকে জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আর অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ। ত্রিশের আগে এবং কিছু পরে কবিতার যে বাঁক বদল ঘটেছে সেসবের প্রচুর নথিপত্র, সমালোচনা, পত্রিকা, ছোটকাগজ
সময়ের সাক্ষী হিসেবে দাবি রাখে। ভারতবর্ষের বাইরে তখন ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার অবস্থান কোথায় সেটাও দেখে নেয়া যেতে পারে এই লেখার মধ্যে। তবে ধরা হয়ে থাকে ইংরেজি কবিতায় আধুনিকতার কালপর্ব বাঙলা কবিতার অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। আধুনিক ইংরেজি কবিতার দুই দিকপাল টিএস এলিয়ট এবং এজরা পাউন্ড। টিএস এলিয়টের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। এবং এই কাব্যগ্রন্থকে বলা হয় আধুনিক কবিতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনবদ্য কাজ। এই কাব্যগ্রন্থের ‘এ গেইম অফ চেজ’ কবিতার কিছু অংশ পড়ে নেয়া যাক-
The Chair she sat in, like a burnished throne,
Glowed on the marble, where the glass
Held up bz standards wrought with fruited vines
From which a golden Cupidon peeped out
(Another hid his ezes behind his wing)
Doubled the flames of sevenbranched candelabra
Reflecting light upon the table as
The glitter of her jewels rose to meet it,
(A Game of Chess, The Waste Land, 1922)
এই কবিতায় এলিয়ট ছন্দকে ছেঁটে দিয়েছেন এবং বাক্যগুলোকে যথা ইচ্ছা ব্যবহার করে দেখিয়েছেন কবিতার মধ্যে আবেগ অনুভূতির কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি বরং এক নতুন অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তবে সে অভিব্যক্তি কোথায়? কবিতার শব্দে, বয়ানে, কাহিনিতে, উপস্থাপনাতে রয়েছে নতুনের গন্ধ। এই দীর্ঘ কবিতার দুটি স্তরে দুজন নারীকে দেখানো হয়েছে, একজন উচ্চ সমাজের আরকেজন মধ্যমা ভিত্তিক পরিবেশের। এবং এই দুজনের দুধরনের আধুনিক যৌনাচার নিয়ে অন্দরমহলের দুটি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে ‘দ্যা ওয়েস্ট ল্যান্ড’ পুরো কাব্যগ্রন্থটি হচ্ছে আধুনিক সময়ের বিবাহ তথা বিবাহ-উত্তর দিন যাপনের নিত্য দিনের ঘটনা প্রবাহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর সেটা অবশ্যই যৌন সম্পর্কের। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কাব্যগ্রন্থ পড়লে মনে হতে পারে লন্ডন শহরের কোনো পাবে বসে পানীয়র স্বাদ অন্বেষণের পাশপাশি সামাজিক বর্ণিল কথোপকথন উপভোগ করা। যেভাবে অফিস শেষ করে এসে একফোঁটা বিনোদন বা প্রশান্তি অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘চিল আউট’ করার জন্য নারীরা মদের টেবিলে আড্ডায় মত্ত হন। শুধু নারী নন, পুরুষরাও। যা হবার তাই, মদের মাদকাতার মাঝে ক্লান্তি ছুটে গেলে নেমে আসে একে অপরের গল্প, যেখানে থাকে বেডরুমের তাপ-উত্তাপ, থাকে জীবনের অপর পিঠে পড়ে থাকা ঘটনা অঘটনা। একসময় রাত গভীর হলে কোনো নারী হয়তো ওফেলিয়ার মতো ‘গুড নাইট’ বলে উঠে পড়েছে। তখন (১৯২২ সালের দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড হিসেবে) এই ঘটনা কি আরও তিনশ’ বছর আগের কোনো সময়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেল না? উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সেই হ্যামলেটকে মনে করিয়ে দেয় ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট প্রকাশিত হয় ১৫৯৯-১৬০১-এর মধ্যবর্তীকালে। তখনকার ওফেলিয়ার মতো নারীরা গত শতাব্দি তো বটেই এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও অবহেলিত নানা কারণে আর নানা বিভাজনে।
‘পথের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনি আর মন যে কেমন করে বুঝতে পারি নে। সেই ব্যথাকে চেনা সুখ-দুঃখের সঙ্গে মেলাতে যাই, মেলে না। দেখি, চেনা হাসির চেয়ে সে উজ্জ্বল, চেনা চোখের জলের চেয়ে সে গভীর। আর, মনে হতে থাকে, চেনাটা সত্য নয়, অচেনাই সত্য। মন এমন সৃষ্টিছাড়া ভাব ভাবে কী করে?
কথায় তার কোনো জবাব নেই।
আজ ভোরবেলাতেই উঠে শুনি, বিয়ে-বাড়িতে বাঁশি বাজ্চে।
বিয়ের এই প্রথম দিনের সুরের সঙ্গে প্রতিদিনের সুরের মিল কোথায়। গোপন অতৃপ্তি, গভীর নৈরাশ্য; অবহেলা, অপমান, অবসাদ; তুচ্ছ কামনার কার্পণ্য, কুশ্রী নীরসতার কলহ, ক্ষমাহীন ক্ষুদ্রতার সংঘাত, অভ্যস্ত জীবনযাত্রার ধূলিলিপ্ত দারিদ্র্য- বাঁশির দৈববাণীতে এসব বার্ত্তার আভাস কোথায়?’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঁশি, লিপিকা, ১৯২২)
১৯২২ সালে কবিতার জগতে কবিগুরুর আবির্ভাব যেন এক অন্যরূপে, অন্য বেশে, অন্য মননে। তিনি কবিতার নতুন নির্মাণ কাজে হাত দিলেন। শাসন করলেন কবিতাকে। পুরো ‘লিপিকা’ কাব্যগ্রন্থ লিখলেন গদ্য কবিতায়; এ যেন বাঙালি পাঠকের কাছে শান্ত আকাশে হঠাৎ ধূমকেতু দেখা দেয়ার মতো। একাজ তিনি নিরীক্ষার জন্য হাতে নিয়েছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘আর, মনে হতে থাকে, চেনাটা সত্য নয়, অচেনাই সত্য। মন এমন সৃষ্টিছাড়া ভাব ভাবে কী করে?’ এতো সুস্পষ্ট করে কথাকে কবিতায় বলা যায়! রঙ ছাড়া এতো সহজ করে মনের ভাবকে তুলে আনা যায়! রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন কবিতাকে তুচ্ছ করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার জোড়া দিলে অন্য ভাবের সঞ্চারণ হয়। মালা বদলের গান যখন বাজে তখন বাঁশি কি কবিতার কথা বলে? আধুনিকতা যেখানে স্পষ্ট সেখানে কোনো ভনিতা নেই, যেন বাক্সে তুলে রাখা কথাকে বাক্সেই রেখে কবি লিখলেন- ‘আজ ভোরবেলাতেই উঠে শুনি, বিয়ে-বাড়িতে বাঁশি বাজ্?চে।’ এর চেয়ে নিটোল বাক্য আধুনিক গদ্য কবিতার ক্ষেত্রে আর কী হতে পারে? অর্থাৎ তিনি বাংলা কবিতাকে যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ভেঙেছেন, তার উত্তর, তাঁর প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থেই বিদ্যমান। ‘লিপিকা’ কাব্যগ্রন্থের সৃষ্টির রসদ নিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখাও লিখেছিলেন। গীতাঞ্জলি কাব্যের অনুবাদ ইংরেজিতে করতে গিয়ে অনুভব করেছিলেন যে বাঙলা কবিতাকে কীভাবে ছন্দ থেকে মুক্তি দেয়া যায়। মজার বিষয় হলো ‘সময়’; প্রতিটি ফলাফলের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯২২ সালে একদিকে টিএস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘লিপিকা’ কাব্যগ্রন্থ। এর পরবর্তীতে কবিগুরু আবার ফিরে যান ছন্দোবদ্ধ রচনায়। এবং সেখানেও রচিত হয়েছে ‘বীথিকা’ বা ‘পুনশ্চ’র মতো কাব্যগ্রন্থ।
১৯২৫ সালে রবিঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৫ নভেম্বর ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়োনেস আইরেসে বসে লেখেন ‘অতিথি’ কবিতা হয়তো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথিয়েতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই লেখা।
‘প্রবাসের দিন মোর পরিপূর্ণ করি দিলে নারী,
মাধুর্যসুধায়; কত সহজে করিলে আপনারি
দূরদেশী পথিকেরে, যেমন সহজে সন্ধ্যাকাশে
আমার অজানা তারা স্বর্গ হতে স্থির স্নিগ্ধ হাসে
আমারে করিল অভ্যর্থনা। নির্জন এই বাতায়নে
একালে দাঁড়ায়ে যবে চাহিলাম দক্ষিণগগনে’
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতিথি, পূরবী, ১৯২৫)
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন এবং পরবর্তী বছরে তা ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো গীতাঞ্জলি কাব্যের ফরাসি অনুবাদ পড়ে রাবীন্দ্রীয় অনুরাগে আকৃষ্ট হন। এর প্রায় দশ এগারো বছর পর কবিগুরু মেক্সিকো ভ্রমণের পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে আর্জেন্টিনাতে যাত্রা বিরিতি করেন এবং ওকাম্পোর আতিথেতায় সাড়া দিয়ে মেক্সিকোর সান ইসিদ্রো শহরে প্রায় দু’মাস কাটিয়ে যান। আর এসময়ে কবি তাঁর উপলব্ধিতে সৃজনের প্রশাখায় অনুভবের সকল পারদ ছড়িয়ে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ লিখে শেষ করেন। শান্তিনিকেতন ফেলে কবি পাড়ি দেন আটলাল্টিক মহাসাগর। উষ্ণ আবহাওয়া, নরম রোদ্দুর, মোহনীয় প্রাকৃতিক অবয়ব আর ওকাম্পোর অতিথিসেবা কবিকে আরও বেশি কাব্যিক করে তোলে। শারীরিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি কবি এক নতুন সূর্যোদয় দেখতে পান তাঁর লেখালেখির মধ্যে। তিনি লেখেন- ‘নির্জন এই বাতায়নে একেলা দাঁড়ায়ে যবে চাহিলাম দক্ষিণগগনে/ উর্দ্ধ হতে একতানে এল প্রাণে আলোকেরেই বাণী;’। যখন নির্জন আকাক্সক্ষার পালক উড়ে যায় দখিন জানালা পেরিয়ে তখন সেই পালকের ভেতর গেঁথে দেন কবি তাঁর চোখের নীল মনি। কবি তো স্প্যানিশ জানেন না তবু এক কবি আর এক কবিকে বুঝে নেন তাঁর কাব্যিক ভাষা দিয়ে। চোখের অনুরণন দিয়ে, আবগে দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে। কবি যেন চিরদিন আলোর অতিথি হিসেবে গিয়েছেন সেখানে আর ওকাম্পো তারার দৃষ্টি দিয়ে কবির জন্য কল্যাণ কামনা করছেন। ওকাম্পোর মনের কথা কবি অকপটে বলেছেন- ‘জানি না তো ভাষা তবে, হে নারী, শুনেছি তব গীতিপ্রেমের অতিথি কবি, চিরদিন আমারি অতিথি’। একজন কবিগুরুরই সাধ্য ছিল ওকাম্পোর মনের কথা বুঝে নেয়ার। কবি নিজেকে দূরদেশী পথিক বলেছেন, সন্ধ্যার আকাশে জ্বলে থাকা পুঞ্জ তারা তাঁকে যেন দেখিয়েছে এই অচেনার পথের সন্ধান। কবি নতুন আলোর উদ্ভাসে হয়ে ওঠেন পরিপূর্ণ; নারীর মাধুর্যসুধায় কবি অজান্তেই শুষে নিলেন এক ভিনদেশী অক্সিজেন। কবির এই অতিথি কবিতা আতিথিয়েতার এক পূর্ণ বয়ান যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সূচনা আর সমাপ্তির সব আঁকাবাঁকা রাস্তা। যেখানে পৃথবী প্রদক্ষিণ করলে আলোছায়া নেচে যায় প্রাকৃতিক নিয়মে। সে নিয়ম ভেঙে কবিই কেবল হয়ে উঠতে পারেন মাহাকালের যাত্রী।
১৯৩৪ সালে ‘ভুল’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন তাঁর গতানুগতিক ধারায়। জীবনানন্দ দাশ ‘নগ্ন নির্জন হাতে’-এর মতো কবিতার আত্মপ্রকাশ ঘটালেন ১৯৩৪ সালে। আর একই বছর ওয়েলসের ডিলান থমাস লিখলেন ‘হোয়েন অন্স দ্য টয়লাইট লকস নো লঙ্গার’-এর মতো কবিতা। রবীন্দ্রনাথের ‘ভুল’ এবং ডিলান থমাসের ‘হোয়েন অন্স দ্য টয়লাইট লকস নো লঙ্গার’ দুটি কবিতাই ছন্দে লেখা এবং আধুনিক কবিতা। অমিল অনেক জায়গায় যেমন
থমাসের কবিতায় রয়েছে সুররিয়ালিজম এবং সিনট্যাকটিক ও সেমান্টিকের মিশ্রণ অন্যদিকে কবিগুরুর কবিতায় রয়েছে ১২-৮, মাত্রার অক্ষরবৃত্তের ছন্দ। থমাসের সেই সময় চলছে সুরিয়ালিজমের আধিপত্য কারণ অ্যান্ড্রে ব্রেটন ১৯২৪ সালে পরাবস্তববাদের সূচনা ঘটিয়েছেন। সেসব দিক থেকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা ভিন্ন। গদ্য কবিতার মধ্যে যেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে ঢেলে দিয়েছেন প্রেম-প্রণয়ের সোজাসাপ্টা বর্ণনা, আবেগ অনুভূতির বেহালায় ভৈরবী সুর বাজিয়ে পাঠককে বিমোহিত করেছেন। মর্মভেদী তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে আছে সঞ্জিবনী শক্তি।
‘অবমানিতা, জান না তুমি নিজে
মাধুরী এল কী যে
বেদনাভরা ত্রুটির মাঝখানে।
নিখুঁত শোভা নিরতিশয় তেজে
অপরাজেয় সে যে
পূর্ণ নিজে নিজেরই সম্মানে।
একটু খানি দোষের ফাঁক দিয়ে
হৃদয়ে আজ নিয়ে এসেছ, প্রিয়ে,
করুণ পরিচয়-
শরৎপ্রাতে আলোর সাথে ছায়ার পরিণয়।’
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভুল, বিথীকা, ১৯৩৪)
‘আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হ’য়ে উঠেছে :
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি,
সে নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে।’
(জীবনানন্দ দাশ, নগ্ন নির্জন হাত, বনলতা সেন, ১৯৩৪)
‘When once the twilight locks no longer
Locked in the long worm of my finger
No damned the sea that sped about my first,
The mouth of time sucked, like a sponge,
The milky acid on each hinge,
And swallowed dry the waters of the breast.Õ
(Dzlan Thomas, When once the twilight locks no longer, 18 Poems ১৯৩৪)
ওপরের তিনটি কবিতাকে পাশাপাশি রেখে একটি তুলনামূলক আলোচনা দাঁড় করানোর প্রয়াস। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৪ সালে ‘পাঠিকা’ ‘ভুল’ আর ‘উদাসীন’ আরও বেশ কিছু কবিতা লেখেন। এই তিনটি কবিতাই শান্তিনিকেতনে বসে লেখা। ‘ভুল’ কবিতা রবীন্দ্রনাথ এক বালিকাকে সম্বোধন করে লিখেছেন। অশ্রুসজল চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কবির সামনে। বালিকার অস্ফুট রব কবিকে আরও ভাবিয়ে তুলেছে কারণ সে যে চঞ্চললা চপলা কিন্তু ভুল গানের সাথে ভুল লয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে। কবিগুরু তা মেনে নেবেন কেন। কিন্তু পরিশেষে কবি যেন সমবেদনা প্রকাশ করে অধিকারের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ‘এল তোমার প্রদোষবেলা সাঁঝের তারা হাতে’ এভাবে কবি বালিকার জন্য প্রার্থনা করেছেন যে, পৃথিবী ছায়া মেখে নিতে নিতে আকাশ থেকে তারার দল নেমে আসুক। অমলিন চোখ চেয়ে থাক গৌরবের গিরিশিখরে। এভাবে ছোট্ট একটি মহূর্তের অবতারণা ঘটিয়ে একজন রমণীকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সত্যের সাথে। যেখানে ফুটে উঠেছে ইমেজ আর অলংকারের কারুকাজ। যেখানে ছোট্ট একটি গল্পের শুরু আছে শেষও রয়েছে। ফুটে উঠেছে এক পরিচ্ছন্ন চিত্রকল্প। এবার আসা যাক কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতা নিয়ে। এখানে জীবনানন্দ দাশ ট্র্যাডিশনাল ছন্দ ভেঙে এক দুরন্ত ঘোড়া ছুটিয়েছেন গদ্যকবিতার সীমানায়। জীবনানন্দ দাশ মনোনিবেশ করেছেন কঠিনে আর তার ফলশ্রুত ‘নগ্ন নির্জন হাত’-এর মতো কবিতা। সেই একই বছর অর্থাৎ ১৯৩৪ সালে ডিলান থমাস লিখেছেন ‘হোয়েন অন্স দ্যা টয়লাইট লকস নো লঙ্গার’-এর মতো ছন্দোবদ্ধ কবিতা যেখানে রয়েছে অধুনিকতার ছোঁয়া। এই কবিতায় একটি নির্দিষ্ট ইমেজকে বারবার ব্যবহার করছেন কারণ সেটাকে কবিতার ক্ষেত্রে যৌক্তিক এবং অর্থবোধক বলে। এই কবিতায় রয়েছে ইমেজ অর্থাৎ চিত্রকল্পের ব্যবহার, রয়েছে সিমিলি এবং মেটাফোরের সংমিশ্রণও। রবীন্দ্রনাথের কবিতার আলোচনাটা ছিল বাঙলা কবিতার কালাত্তীর্ণ সময় ‘ত্রিশ’কে নিয়ে। এই ত্রিশে বাঙলা কবিতার পাশাপাশি ইংরেজি কবিতার পরিবর্তনও দেখা যায় তবে সেটা প্রকট নয়, কারণ টিএস এলিয়ট এবং এজরা পাউন্ড অনেক আগেই আধুনিক কবিতার নির্মাণের কাজ করেছিলেন। আর তারই উৎসধারা এসে পড়েছিল বাঙলা কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন কালজয়ী কবিতা ‘সাধারণ মেয়ে’। তবে তিনি ছন্দকে বাদ দিলেন না, বরং ছন্দের মধ্যে আবিষ্কার করলেন বিস্ময়কর কবিতা।
‘কিনু গোয়ালার গলি।
দোতলা বাড়ির
লোহার-গারদে-দেওয়া একতলা ঘর
পথের ধারেই।
লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।
মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
সিদ্ধিদাতা গণেশের
দরজার পরে আঁটা।’
(বাঁশি, পুনশ্চ, ১৯৩২)
‘আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,
চিনবে না আমাকে।
তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাব,
‘বাসি ফুলের মালা’।
তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরন দশা ধরেছিল
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে।
পঁচিশ বছর বয়সের সংগে ছিল তার রেশারেশি-
দেখলেম তুমি মহদাশয় বটে,
জিতিয়ে দিলে তাকে।’
(সাধারণ মেয়ে, পুনশ্চ, ১৯৩২)
গদ্য কবিতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক আলাপচারিতায় অমিয় চক্রবর্তীকে বলেছিলেন- ‘ভাবকে এক-একটি ছন্দের কাঠামোর অনুগত্য মেনে চলতে হয়। কিন্তু যাকে গদ্যকবিতা বলা হয় তার নিয়মরীতি স্বতন্ত্র। তার বিশেষত্ব হচ্ছে- ভাবের আনুগত্য স্বীকার করতে হয় ছন্দকে, ভাবের মধ্যে ছন্দের গতিবিধি, ভাবভঙ্গি দেয় ছন্দকে। যদি নতুন বলে এর বিমুখ হও তাহলে এর মধ্যে যে ছন্দ আছে তার পরিচয় পাবে না।’
‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের বাঁশি কবিতা যেন উন্মোচন করল এক নতুন দুয়োর। নতুন দুয়োর এ জন্য বলা যে বিস্তীর্ণ আকাশে জেগে থাকা ধ্রুবতারাকে আলাদা করতে খুব বেশি কষ্ট হয় না। তাই ‘পুনশ্চ’ হলো এক চিরঞ্জীব পিলসুজের মত, আজীবন আলো দিয়ে যায়। একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লিখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সব অসামান্য কীর্তির সাথে আরও একটি পালক যোগ করেছেন- যা আজও সমানভাবে আধুনিক। একটি সাধারণ মেয়ের গল্পকথাকে এক অসীম উচ্চতায় ভাসিয়ে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কেন লিখতে গেলেন এমন কবিতা? ১৯৩২-এর আগে এবং পরে প্রকাশিত কবিতা পর্যবেক্ষণ করলে পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের কবিতা একদমই আলাদা। এ বিষয়ে কবি গুরুর একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে যদিও। তখন যে তিনি ইংরেজি কবিতার পরিবর্তনের ধারাকে উপলব্ধি করছেন এবং বাঙলা সাহিত্যের সমসাময়িক পাঁচ কবির কবিতাও চোখের সামনে দেখছেন, এটা নিশ্চিত। তবে ত্রিশের কবিতাকে যে তিনি গ্রহণ করেননি তা জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রতি তাঁর মন্তব্য দেখে বোঝা যায়। তিনি চেয়েছেন তাঁর মতো করে এই গ্রন্থের কবিতাগুলোকে অন্যরূপ দিতে। সেখানে মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্তকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে পদ্যছন্দের স্পষ্টতা টের পাওয়া যায় না। এই কবিতাগুলোর ভাব এবং শব্দ বিন্যাসে এতোই মুন্সিয়ানা রয়েছে যে পাঠের সময় এক ধরনের টান সৃষ্টি করে এক পঙক্তি থেকে পরের পঙক্তিতে। পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের কবিতার শিরোনামগুলো হচ্ছে- পুকুর ধারে, ক্যামেলিয়া, ছেলেটা, সাধারণ মেয়ে, খোয়াই, শেষ চিঠি, ছুটির আয়োজন সহ আরও অনেক কবিতা। এখন জেনে নেয়া যাক রবীন্দ্রনাথের আত্মপক্ষ কী ছিল- ‘গীতাঞ্জলির গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলেম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণিতে গণ্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজিরই মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কিনা। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম, তিনি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, চেষ্টা করেননি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, ‘লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নি বোধ করি ভীরুতাই তার কারণ। তার পরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মতো এই যে, তার লেখাগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্যে তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি। এই উপলক্ষ্যে একটা কথা বলবার আছে। গদ্যকাব্যে অতিনিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষায় ও প্রকাশরীতিতে যে একটি সসজ সলজ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীনক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এই আমার বিশ্বাস এবং সেই দিকে লক্ষ রেখে এই গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতাগুলি লিখেছি। এর মধ্যে কয়েকটি কবিতা আছে তাতে মিল নেই, পদ্যছন্দ আছে, কিন্তু পদ্যের বিশেষ ভাষারীতি ত্যাগ করবার চেষ্টা করেছি। যেমন ‘তরে সনে মোর’ প্রভৃতি যে-সকল শব্দ গদ্যে ব্যবহার হয় না সেগুলিকে এই-সকল কবিতায় স্থান দিই নি।’
তার কয়েক বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে লেখা ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতায় রয়েছে ছন্দহীনতার ধারাবিকতা এবং মম তম তব প্রকারের শব্দগুলো ছেঁটে দিয়েছেন। কিন্তু বীথিকা (১৯৩৪), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), পত্রপুট (১৯৩৫-৩৬) কাব্যগ্রন্থগুলোতে আবার সেই ছন্দোবদ্ধ কাব্যের কিছু পুনারাগমন দেখা যায়। তবে হ্যাঁ ওসব কাব্যগ্রন্থের কিছু কিছু কবিতা যেমন- আমার বাগানের ফুলগুলিকে, পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ, পঁচিশে বৈশাখসহ বেশ কিছু কবিতা যে নতুন ধারায় লিখেছেন সেটা তাঁর পুনশ্চ পাঠ করলেই বোঝা যাবে কারণ তার রেশ এখানেও ছড়িয়ে আছে। তবে এ কথা বলা যায় পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ তাঁর নিরীক্ষাধর্মী কবিতার এক নব্য নক্ষত্রীয় আবির্ভাব। ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটি লেখা হয় ১৯৩৫ সালের দিকে। এই দীর্ঘ কবিতায় তিনি শৈশবের স্মৃতিময় উঠোন থেকে তুলে এনেছেন হাসিকান্নার প্রতিধ্বনি। একটি সময়কে পেরিয়ে আরেকটি সময়কে গেঁথে নিয়েছেন পলাশ বনের মাতাল ছায়াপথে। কবিতার বাইরের শরীর বৃত্তে রয়েছে গদ্যের বুনন এবং ভেতরে রয়েছে বর্ণনামূলক গদ্যছন্দ। বীথিকার পথে কবে এক বাউল একতারায় শুনিয়েছিল শ্যামাঙ্গিনীর গান সেই থেকে তরঙ্গ মুদ্রিত কোনো চিঠি পড়ে যে কোনো পথিক হয়ে উঠতে পারে সমুদ্র প্রদর্শক। তিনি লিখেছেন- ‘সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে/ দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত/ গুরুগুর মেঘমন্দ্রে।’ ১৯৩৬ সালে লেখা হঠাৎ দেখা কবিতাটি একবার পড়ে নেয়া যেতে পারে। যেখানে কবির পুনশ্চর ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে।
‘আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
সেখানে আমির কথা এসেছে সম্ভবত
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
মনে হল কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চারদিকে,
যে দূরত্ব সর্ষে ক্ষেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।’
(হঠাৎ দেখা, শ্যামলী ১৯৩৬)
আবার ফিরে যেতে হয় ১৯২৮-তে ‘জীবন আঁধার হলে সেইক্ষণে পাইনু সন্ধান/ সন্ধ্যার দেউলীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান’। প্রদোষ ঘনিয়ে এলে আবছায়া এসে চুপিচুপি দাঁড়ায় পেছনে তখন অস্পষ্ট চোখে আলোর প্রদীপ জ্বলে ওঠে; তখন মনের মন্দিরে তার সাড়া কান পেতে শুনতে চান। তিনি কবিতার মধ্যে যে অনুষঙ্গ রেখে যান তার পরিব্যাপ্তি ঘটে পাঠকের হৃদয়ে। অন্যদিকে তিনি তাঁর কবিতার মধ্যে সুগভীর চিন্তা আর চেতনার অভিধানকে চিরদিন অপ্রকাশিত রেখে দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন পাঠকই খুঁজে নিক তাঁর কাব্যের ভেতরকার অনিবার্য মানে। বিধাতার মনে কৃপণতা থাকলেও তিনি কবিতায় যেন দিগন্ত উজাড় করে সাজিয়েছেন উদ্যান। গত শতাব্দির তৃতীয় দশকের আগে ও পরে অর্থাৎ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ সালে বাংলা সাহিত্যে এবং ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার যথাযথ পাল্টে যাওয়ার হাওয়া যে রবীন্দ্রনাথের কলমে লেগেছিল সেসবের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ থেকে। পদ্য কবিতার অবগুণ্ঠন খুলে কবিগুরু গদ্য কবিতার এক স্বাধীন ক্ষেত্রকে আশকারা দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রকে তিনি এতোটাই মর্যাদা দিয়েছেন যে সেখানে ক্যামেলিয়া, সাধারণ মেয়ের মতো ধন্যকাব্য রচনা করে দিগি¦জয়ী কবিতার পালে নতুন নিশান উড়িয়ে দিয়েছেন। অবশেষে এটাই বলতে চাওয়া যে বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে, সাহিত্যে আধুনিকতার যে নতুন বীজ বপণ শুরু হয়েছিল তার ছিটফোঁটা বাংলা সাহিত্যেও পড়েছিল। একদিকে জর্জিয়ান মুভমেন্ট অন্যদিকে সুরিয়ালিজম, ডাডাইজম-এর দাপুটে আবির্ভাব। সেই জর্জিয়ান মুভমেন্টের
উদ্দেশ্য ছিল- ‘The sprit of Mordernism—a radical and utopian spirit stimulated by new ideas in anthropology, psychology, philosophy, political theory, and psychoanalysis was in the air, expressed rather mutedly by the pastrol and often anti-Mordern poets of the Georgian movement(1912-1922)’. সেই সময়ে অর্থাৎ ১৯০৮ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত ইমাজিস্ট মুভমেন্টও ছিল সারা আমেরিকা এবং ইউরোপজুড়ে। সেখানেও আধুনিকতার জন্য কবিরা অগ্রগামী ছিলেন তাদের মধ্যে এজরা পাউন্ড, হিল্ডা ডুলিটল, রিচার্ড অ্যাডলিংটন অন্যতম। তাদের যুদ্ধটা ছিল ‘কেয়ারলেস থিংকিং এবং রোম্যান্টিক অপ্টিমিসমের বিরুদ্ধে’ অর্থাৎ ঔপন্যাসিক ও কবিরা সংকলন ও ম্যাগাজিনের সৃষ্টি ও সাহিত্য গবেষণার এক উল্লেখযোগ্য সময়কে কাজে লাগিয়েছিল তা কেবল সাম্প্রতিক কিংবা অতীত নয় বরং পুরো রোমান্টিক যুগের সাহিত্য ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য। এসবের ছায়া যে বাঙলা সাহিত্যে পড়েছিল তা একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না।