নাসিমা একটা ভালবাসার নাম (গল্প)

নাসিমা একটা ভালবাসার নাম (গল্প)

"নাসিমা,একটা ভালোবাসার নাম"

খায়রুননেসা রিমি-


---২০২০ সালের জানুয়ারির ৩০ তারিখ রাত ১০ টায় খুব মনোযোগ দিয়ে একটা গল্প লিখছিলাম।ঠিক এমন সময় একটা মেসেজ এলো।আমি সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে লিখেই যাচ্ছিলাম।হঠাৎ কি মনে করে মেসেঞ্জারে চোখ পড়তেই দেখি অপরিচিত এক আইডি থেকে কিছু মেসেজ এসেছে।আমি মেসেজগুলো পড়লাম।পড়ে কিছু সময় তাজ্জব হয়ে গেলাম।পরে তার আইডি ঘুরে দেখলাম, কিছুদিন আগে আমার হাজবেন্ডের যিনি বাইপাস করিয়েছেন সেই চিকিৎসক ডাঃআশ্রাফুল হক সিয়ামের বন্ধুতালিকায় তিনি আছেন।নাম তার সাদেকা সুলতানা।
আমাকে লেখা তার প্রথম মেসেজ 
ঃআচ্ছা কিছু মনে করবেন না।আপনাকে কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?
ঃজি, পারেন।
ঃআপনি কি আমার মামী হন?আসলে আপনাকে আমার মামীর মতো লাগছে।মামীকে অবশ্য আমি খুব বেশি দেখিনি ২/৩ বার দেখোছি।কিন্তু চেহারাটা আমার একদম মনে আছে।
তার প্রশ্ন শুনে আমি বিস্মিত হলাম।
ঃমামী!কি বলেন আপনি?আপনি কি আমাকে চেনেন?
ঃনা, এফবিতেই  আপনার সাথে আমার পরিচয়।
ঃকি নাম আপনার মামার?
ঃআশরাফুল,আপনি কি আমার আশরাফুল মামার বউ?
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
ঃআশরাফুল হক সিয়াম আপনার মামা হয়?উনিতো আমারও মামা হয়।তবে সেটা এলাকাত।
ঃনা, না।ওর কথা বলিনি।আস্রাফুল হক সিয়াম তো আমার খালাতো ভাই। ও আমার ১ বছরের জুনিয়র।আমি আশরাফুল মামার কথাই বলেছি।
তখনও পর্যন্ত আশরাফুল বলতে আমি আশরাফুল হক সিয়ামকেই চিনতাম।
ঃআসলে আমি আশরাফুল হক সিয়াম ছাড়া আর কোনো আশরাফুলকে চিনি না।
ঃআমার আশরাফুল মামা কিন্তু আপনার এফবি ফ্রেন্ড।মামা ও মামীর বাড়ি শরিয়তপুরে।আপনার বাড়িও শরিয়তপুরে
তাই ভাবলাম আপনি আমার মামী হন।স্যরি কিছু মনে করবেন না।তার চেহারার সাথে আপনার অদ্ভুত মিল থাকায় আমি আপনাকেই আমার আশরাফুল মামার বউ মনে করেছি।
ঃনা না কিছু মনে করার কি আছে।ভুল তো হতেই পারে।
এভাবেই তার সাথে আমার পরিচয়।মাঝে মাঝে কথা হয় ইনবক্সে।তার সাথে আমার সম্পর্ক যখন দোস্ত পর্যায়ে চলে এলো তখন জানলাম  আত্মীয়তার সম্পর্কে উনি আমার খালা হন আর ডাঃসিয়াম আমার মামা হয়।
গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই সাদেকা খালা আমাকে তার সেই আশরাফুল মামা ও মামীর ছবি ইনবক্স করলো আর বললো,
ঃখালা, এই হলো আমার সেই মামা ভুল করে আমি আপনাকে যার বউ বানিয়েছিলাম,আর পাশে যিনি আছেন তিনি আমার মামী লিখেই পাশে হাসির ইমোজি দিল।
আমি  ইনবক্সে পাঠানো ছবিটা ভালো করে দেখলাম।দেখে কৌতুহলবশত তার আশরাফুল মামার ওয়ালে ঘুরতে গেলাম।সেখান থেকে গেলাম তার মিসেসের ওয়ালে যার চেহারার সাথে আমার মিল পেয়ে সাদেকা খালা ভুল করেছিলেন।তার আইডির নাম নাসিমা আক্তার।নাসিমা আক্তারের ওয়ালে গিয়ে তার গানের ভিডিও দেখে ও গান শুনেই আমি মুগ্ধ  হয়ে গেলাম।মাশাল্লাহ এত ভালো গানের কণ্ঠ!একটা গান শুনেই সাথে সাথে তাকে রিকো পাঠালাম।অবাক কাণ্ড আমি রিকো পাঠানোর ২ সেকেন্ডের মধ্যেই নাসিমা আক্তার আমার রিকো এক্সেপ্ট করে নিল। 
তার গান আমার ভালো লেগেছে বলে মেসেঞ্জারে তার গানের তারিফ করে একটা মেসেজ দিলাম।সাথে সাথে সে মেসেজ পড়েই রিপ্লাই দিল।
ঃধন্যবাদ আপা।
আচ্ছা, আপা আপনাকে  একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
ঃজি করুন।
ঃ আপনার বাড়ি কি শরিয়তপুরে?আপনাকে আমার ভীষণ চেনা চেনা লাগছে।মনে হচ্ছে আগে অসংখ্যবার আপনাকে আমি দেখেছি।আচ্ছা স্কুল জীবনে কল্পনা নামে আপনি কাউকে চিনতেন?
ঃহুমম আমি শরিয়তপুরের  মেয়ে।আর কল্পনা আমার বান্ধবী। 
ঃআপা এই জন্যই আপনাকে আমার এত চেনা চেনা লাগছে।কল্পনা আপা আমার আপন বড় বোন।ছোটবেলায় আপনাকে আমি কতো দেখেছি।আমিও শরিয়তপুর গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলাম।স্কুলেতো আপনাকে দেখেছিই আর তাছাড়া আপনিতো আপার বিয়েতেও আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।আমি তখন ছোট ছিলাম।ক্লাস ফাইভে পড়তাম।তখন থেকেই আপার মতো আমিও আপনার লেখার ভক্ত ছিলাম।কি সুন্দর কবিতা লিখতেন আপনি! আমার সব মনে আছে।৩০ বছর পরেও ফেসবুকে আপনার ছবি দেখেই আমি আপনাকে চিনে ফেলেছি।আপনার ছবিটা আমার মনের মধ্যে গাঁথাই ছিল।কিযে আনন্দ লাগছে এত বছর পরে আপনাকে খুঁজে পেয়ে।
নাসিমার কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।ঐ ছোট বয়স থেকেই সে তার মনের মধ্যে আমাকে জায়গা দিয়েছে,আমার লেখা তার হৃদয়ে দাগ কেটেছে।৩০ বছর পরেও সে আমার ছবি দেখেই আমাকে চিনে ফেলেছে।অত ছোট বয়সের স্মৃতি মনে থাকারই কথা না।অথচ মেয়েটি আমাকে এই ভাবে মনে রেখেছে!
আনন্দে আমার চোখে জল চলে এলো।কাছে থাকলে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিতাম।ওর এই ভালোবাসার মূল্য আমি কিভাবে দিব?আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী।কতো মানুষ আমাকে ভালোবাসে।এতদিন আমি কারো কারো ভালোবাসা না পেয়ে নিজেকে খুব হতভাগী ভাবতাম।মিথ্যা কষ্ট পেতাম।নাসিমা,কল্পনার ভালোবাসার কাছে অন্যসব ভালোবাসা এখন আমার কাছে খুব তুচ্ছ মনে হয়।এমনকি মনবালকের ভালোবাসাও।
যাহোক সেদিন যদি নাসিমার গানে মুগ্ধ হয়ে ওকে রিকো না পাঠাতাম তবে হয়তো কোনোদিন জানাই হতো না আমার প্রতি ওর এত ভালোবাসার কথা।এত চমৎকার ওর গানের কণ্ঠ সেটাও হয়তো জানা হতো না কখনই।ওর গান আমার এত ভালো লাগে যে এখন আমি প্রতিদিনই ওর গান শুনি।
এবার তার সম্পর্কে কিছু বলি,
নাসিমা আক্তার আমার ছোট বোন,শরিয়তপুরের সংস্কৃতাঙ্গনে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ছিল তার ব্যাপক পরিচিতি।বিয়ের আগে শরিয়তপুর কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সব সময় প্রথম স্থান অধিকার করতো।নাসিমা শরিয়তপুর  জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সঙ্গীতের উপরে ৫ বছরের কোর্স করেছে।বিয়ের পরে শ্বশুর, শাশুড়ী ও হাজবেন্ডের অনুপ্রেরণায় ঢাকা, মতিঝিল বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে সঙ্গীতের উপর ৩ বছরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। বর্তমানে রামপুরা সঙ্গীতকলা একাডেমিতে নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করছে।ইতিমধ্যেই সে বিটিভিতে ফোক গানের তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়ার অডিশন দিয়ে প্রাথমিক ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।আশাকরি চূড়ান্ত অডিশনেও নাসিমা সফলতার সাথেই উত্তীর্ণ হবে।এই গুণী শিল্পী বর্তমানে ঢাকার মুগদা এলাকার হায়দার আলী স্কুল এন্ড কলেজে সহকারী  শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছে।ব্যক্তি জীবনে নাসিমা ২ পুত্র সন্তানের জননী।স্বামী আশরাফুল আলমও একজন শিক্ষক, সেই সাথে লেখকও।
নাসিমার মতো একজন গুণী শিল্পী আমার বোন (যদিও বন্ধুর বোন তবুও আমি তাকে নিজের বোনই মনে করি ) ভাবতেই মন ভরে যায়। যোগাযোগ না থাকার পরেও ৩০ বছর ধরে যে আমার মতো অধমবান্দাকে মনে রেখেছে এটা যে আমার কত বড় প্রাপ্তি তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা এই প্রিয় বোনটি ও তার পরিবারের জন্য।