রৌদ্র করোটির কবি -শামসুর রহমান

রৌদ্র করোটির কবি -শামসুর রহমান

নূরজাহান শিল্পী---

বৃক্ষের নিকটে গিয়ে বলি,
দয়াবান বৃক্ষ তুমি একটি কবিতা দিতে পারো?
বৃক্ষ বলে আমার বাকল ফুঁড়ে আমার মজ্জায় যদি মিশে যেতে পারো,তবে হয়তো বা পেয়ে যাবে একটি কবিতা।
জীর্ণ দেয়ালের কানে বলি,
দেয়াল আমাকে তুমি একটি কবিতা দিতে পারো?
পুরনো দেয়াল বলে শ্যাওলা -ঢাকা স্বরে ,
এই ইট সুরকির ভেতর যদি নিজেকে গুঁড়িয়ে দাও তবে,
হয়তোবা পেয়ে যাবে একটি কবিতা...
নতজানু কবিতার কাছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আধুনিক কবি শামসুর রহমান পেয়ে ছিলেন আশ্রয়।
ইতিহাস আজীবন মানুষকে তাড়িত করে ভাবায় কথা বলে আবেগে আপ্লুত করে।
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শামসুর রহমানের ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বিংশ শতকের ত্রিশের দশকের  তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার স্রষ্টা।
তার কবিতার মানবধর্মিতা ভিন্ন রূপ দিয়েছে।
আধুনিক কবিতার পথিকৃত জনক
দেশ, দেশের মানুষ আর স্বাধীনতার কথা বারবার উঠে এসেছে যার কণ্ঠে; তিনি নগর কবি শামসুর রাহমান। নগরের বিবিধ বিষয়-আসয় সাবলীলভাবে কবিতায় ধারণ করেছেন বলেই তিনি নাগরিক কবি। তবে তিনি একাধারে প্রেমের কবি, মানবতার কবি এবং স্বাধীনতার কবিও।
 স্বদেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক।বেদনার্ত হৃদয়ের বাহক হয়ে রচনা করেছেন অজস্র কবিতা। শামসুর রাহমানের কবিতায় বেদনা, দুঃখবোধ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। দুর্বোধ্যতার সমস্ত কাঁটাতার ছিন্ন করে তিনি পৌঁছে গেছেন সব শ্রেণির পাঠকের কাছে। হয়ে উঠেছেন গ্রহণীয় ও প্রিয়।
পঞ্চাশ দশক থেকে বাঙালি জাতির নানা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি, বৃটিশ ও পশ্চিমাদের শোষণের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার কণ্ঠ কবিতায় নির্মিত হয় এক অনন্য বাকপ্রতিমা। এ জন্য তাকে স্বাধীনতার কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’, কখনো আমার মাকে ,‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, রুপালি স্নান, ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’-এর মত কবিতাগুলো রচনা করে স্বাধীনতার কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন এই শব্দের ফেরিওয়ালা।
 বাংলা কবিতা সত্যিকার অর্থে পোশাকে ও আশাকে, মেজাজে ও মননে আধুনিক হয়ে ওঠে হাতেগোনা যে ক’জন কবির অক্লান্ত সাধনায়; তাঁদের একজন কবি শামসুর রাহমান। যিনি আপাদমস্তক শুধুই একজন কবি।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন কবি শামসুর রাহমান। তাঁর পৈত্রিক নিবাস বর্তমান নরসিংদী জেলায়। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মা আমেনা বেগম। পুরনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে।
শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাস করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। কবি শামসুর রাহমান ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরনো কর্মস্থল দৈনিক মর্নিং নিউজে। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নভেম্বর ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক পাকিস্তানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন; ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭ সালে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অতঃপর তিনি অধুনা মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জীবদ্দশায় তাঁর ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১টি প্রবন্ধগ্রন্থ, ১টি ছড়ার বই ও ৬টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি অর্জন করেছেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার, মিৎসুবিসি পুরস্কার (সাংবাদিতার জন্য), স্বাধীনতা পদক, আনন্দ পুরস্কার। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে এই মহান কবিকে।(তথ্য নেট থেকে)
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কবি। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে। কবি শামসুর রাহমান আমাদের গর্ব; যার হৃদয় বাংলাদেশের কথা বলেছে।

কবির মৃত্যু বার্ষিকীতে অসীম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
 বাংলাভাষীর পক্ষ থেকে কবিকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
রুপালি স্নানে ভালো থাকুন কবি।
নূরজাহান শিল্পী
সাহিত্য সম্পাদক (প্রাণের নিত্যধারা।)
বাংলাভাষী অনলাইন পোর্টাল।