‘সাইবেরিয়ান বার্ডদের’ থেকে রাজনীতিকে রক্ষা করতে হবে

‘সাইবেরিয়ান বার্ডদের’ থেকে রাজনীতিকে রক্ষা করতে হবে

বাংলাভাষী ডেস্কঃ
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, আওয়ামী লীগাররাই আওয়ামী লীগ করবে। দুর্দিনের সাহসী, সৎ নেতাকর্মীরাই সবখানে কাজ করবে। এখানে ‘ভাই লীগ’-‘এমপি লীগ’-এর কোনো সুযোগ নেই। ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। সেখানে কিন্তু এদের প্রয়োজন হয়নি। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে, তারা কিন্তু অপকর্ম করবে। দলের নাম ভাঙিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করবে। আবার সময়ে উড়ে যাবে। উড়ে আসা পাখি উড়ে যায়। তাকে ধরে রাখা যায় না। এদের বলে ‘সাইবেরিয়ান বার্ড’। এদের হাত থেকে রাজনীতিকে রক্ষা করতে হবে।

সম্প্রতি দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশকারীদের দলে প্রবেশ কেন বন্ধ করতে পারছে না-এমন প্রশ্নের জবাবে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি মাল্টিক্লাস অর্গানাইজেশন। এখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আছে। ফলে অনেকে ঢুকে পড়ে। তবে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বা অন্যায় অপকর্মের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের দলে জায়গা না দেয়ার বিষয়ে আমাদের পার্টির সিদ্ধান্তই রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দলের সব নেতাও যে ধোয়া তুলসী পাতা, তা বলতে পারব না। ফলে যারা দলে ঢুকেছে, তারা কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে কাউকে-না-কাউকে খুশি করেই ঢুকেছে। আবার যারা নিয়েছে, তারা নিয়েছে দল ভারি করার জন্য। যারা রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শে সমৃদ্ধ নয়, তারাই এভাবে দলে ঠাঁই দিয়েছে। এতে তারা নিজেদেরও কলুষিত করেছে আবার দলেরও ক্ষতি করেছে। তবে এটাও ঠিক, কেউ বুঝে করেছে, কেউ না বুঝে করেছে।

আওয়ামী লীগকে পরিশুদ্ধ করতে আগামী দিনে আরও কঠোরতা অবলম্বন করা হবে জানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা বলেন, দলের ভেতরের কেউ যদি অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেয়, লালন-পালন করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগে পরিশুদ্ধতার সেই কাজটি আমরা করব। সাহেদ, সাবরিনা, পাপিয়া, জি কে শামীম বা ক্যাসিনোর অধিপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যারা যুক্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের কোনো নেতাকর্মী এটার সঙ্গে যুক্ত থাকলে, কীভাবে তাকে শায়েস্তা করতে হয়, সেটা তো ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন। যাদের ধরেছে আওয়ামী লীগ সরকারই ধরেছে। কেউ তো দেখিয়ে দেয়নি। এই সাহেদ তো আরও আগেও ছিল। বিএনপির আমলেও ছিল। তখনই অপকর্ম করেছে। তাকেও কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারই ধরেছে। অপকর্ম যেই করুক, সে আওয়ামী লীগ করা, যুবলীগ করা, ছাত্রলীগ করা, স্বেচ্ছাসেবক লীগ করা-কাউকে কি ছাড় দেয়া হয়েছে? এটা অতীতে কেউ কখনও করে নাই। শেখ হাসিনা সেই সাহস দেখিয়েছেন।

এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান পর্যায়ক্রমে সারা দেশে হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি বুঝে-শুনে সঠিক সময়ে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই নেন। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একটা বলা বলতেন: ‘বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে, কিন্তু শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়া পাওয়া যায় না।’ এটা কিন্তু আবারও প্রমাণ হয়েছে। সুতরাং এটা শুধু ঢাকায় বা স্বাস্থ্যে নয়। আরও অনেক জায়গায় হবে। শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। তিনি যেটা শুরু করেছেন, তা কিন্তু থামবে না।

এখনও আগস্ট মাস এলেই আওয়ামী লীগ কেন ষড়যন্ত্রের শঙ্কা প্রকাশ করে, জানতে চাইলে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। তখন কিন্তু দ্রব্যমূল্যসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল উল্টো। বঙ্গবন্ধু ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে কিছু বিষয়ে যখন অস্বাভাবিকতা শুরু হয়, তখন এই নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক, ষড়যন্ত্রকারী, রাজনীতি ও গণতন্ত্র ধ্বংসকারী, স্বৈরাচারী মানসিকতা, ধর্মাদ্ধ, জঙ্গিবাদ, আইএসআই, পাকিস্তান এবং সহযোগীরা কিন্তু সম্মিলিতভাবেই এগুলো করে। এটাই আমরা দেখে আসছি। ফলে এখনও সেটা কিন্তু হচ্ছে। এই করোনার সময়ও কিন্তু অনেকে বলেছে: এবার একটা ম্যাসাকার হবে। লাখ লাখ মরবে। সরকার পড়ে যাবে। তারা অটোমেটিক ক্ষমতায় আসবে! এই আশায় তারা ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে সেটা কেটে গেছে। কিন্তু তারা বসে নেই। কনক সরোয়ার, সারওয়ার্দী, ব্রাউনিয়া এদের এই যে কার্যকলাপ, এগুলোর মধ্যে কিন্তু একটা যোগসূত্র আছে। খালেদা জিয়া বলে ‘ঈদের দিন একটা কিছ– হতে যাচ্ছে’! মানেটা কী? এই সব কিছু তো ফেলে দেয়া যায় না। তারেক রহমান লন্ডন থেকে যা করছে! লন্ডনের সঙ্গে কনক সরোয়ার, সারওয়ার্দী, ব্রাউনিয়া এদের সম্পর্ক আছে না? পয়সা কোথায় থেকে আসে? কোথা থেকে তারা এগুলো করে? সাহস কোথা থেকে পায়? এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি আরও অপশক্তি আছে। যারা সব সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে।

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি দলটার সৃষ্টিই হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে। এটা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটা একটা জগা-খিচুড়ি দল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী নীতি-আদর্শহীন বিভিন্ন ক্লাবগুলোকে নিয়ে জিয়া একটা বড় ক্লাব গঠন করেছেন। ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়েই তাদের জন্ম। ষড়যন্ত্রের রাজনীতিই তারা প্রতিষ্ঠা করেছে। ষড়যন্ত্র করেই তারা সরকারে এসেছিল। ফলে তারা ষড়যন্ত্রের বাইরে কিছু দেখতে পারে না। জনগণের প্রতি কোনোদিনও তাদের আস্থা ছিল না। ভোটের রাজনীতিতে তারা বিশ্বাস করে না। জনমতকে উপেক্ষা করে তারা সরকারে থেকেছে। এভাবেই তারা সারা জীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। লুণ্ঠন করে সম্পদের পাহাড় গড়তে চায়। সুতরাং তারা (বিএনপি) এবং তাদের নেত্রী (খালেদা জিয়া) ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

করোনাভাইরাস মোকাবেলা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, করোনা সংকট আছে; কিন্তু ভীতিটা কেটে গেছে। সেই আতঙ্কটাও আর নেই। আমরা হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে পারিনি। কিন্তু সেখানেও যেভাবে মানুষ মারা গেছে, সেখানেও যেভাবে বিশৃঙ্খলা হয়েছে, সেই তুলনায় আমরা কিন্তু খুব বেশি খারাপ করিনি। অনেকেই আশঙ্কা করেছিল- বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে! এটা কিন্তু হয়নি। এটা আল্লাহর রহমত আর সরকারেরও কিছু-না-কিছু সফলতা। এটা অস্বীকার করলে ভুল হবে। তবে হ্যাঁ, কিছু অব্যবস্থাপনা ছিল। যা আমরা কাটিয়ে উঠেছি। আমরা মনে করি, এই সংকট যদি দীর্ঘমেয়াদিও হয়, তবুও তা মোকাবেলা করেও শেখ হাসিনা সরকার সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবে।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তৃণমূলের মানুষের সমর্থন বাড়ানোর জন্য ভালো কাজ করতে হবে। অতীতে আমরা একসঙ্গে যেভাবে কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও দেশের ও মানুষের কল্যাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাব। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই কাজ করে যাবে।

আওয়ামী লীগের দল গোছানোর কাজ পুনরায় কবে শুরু হচ্ছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাংগঠনিক কাজ কিন্তু চলমান বিষয়। এটা কখনও বন্ধ হয় না। হয়তো কাজের গতি-প্রকৃতি, ধরন, গতিপথ এগুলোর পরিবর্তন হয়। যেমন এখন করোনা সংকট, এর মধ্যে আম্পান এলো, এখন আবার বন্যা এসেছে। যখন যেগুলো আসবে তা মোকাবেলা করেই রাজনীতি চলবে। ফলে সাংগঠনিক কাজ কিন্তু চলমানই আছে। তবে হ্যাঁ, কমিটি গঠন, কাউন্সিল-এগুলো হয়তো হচ্ছে না। আমি মনে করি, সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আবার শুরু হবে।