স্বার্থহীন আদর্শে উজ্জীবিত সৈয়দ আতাউর রহমান আর নেই

স্বার্থহীন আদর্শে উজ্জীবিত সৈয়দ আতাউর রহমান আর নেই

সাঈদ চৌধুরী

সিলেট শহরে অবিচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের নেপথ্য যোগানদার, সত্যের পথে সাহসের বাতিঘর, স্বার্থহীন আদর্শে উজ্জীবিত লড়াকু সৈনিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আলহাজ সৈয়দ আতাউর রহমান মহান মাবুদের ইচ্ছায় চলে গেছেন তার শেষ ঠিকানায়। ইন্না-লিল্লা-হি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রা-জিউ‘ন।

আজ ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় সিলেট শহরের আখালিস্থ মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মহান আল্লাহ যেন তার সকল ভাল কর্ম সমূহ কবুল করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আজ বাদ আসর মরহুমের গ্রামের বাড়ি জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর দরগাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। 

পারিবারিক সুত্রে প্রাপ্ত সৈয়দ আতাউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন: 

আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমানের জন্ম ১৯৩২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামে। তিনি হযরত শাহ জালালের (র.) সাথী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত সৈয়দ শাহ শামসুদ্দিনের (র.) বংশধর।  

সৈয়দ আতাউর রহমানের পিতা মরহুম হাজী সৈয়দ শমসাদ আলী একজন দ্বিনদার ব্যবসায়ি ছিলেন এবং মা মরহুমা লালকাচাই খানম তৎকালিন সময়ে মহিলাদের মধ্যে দ্বীনি মাসআলা শিক্ষা দানকারী মুবাল্লিগ ছিলেন। তখন গ্রামে উর্দু কিতাব পড়ে তিনি মহিলাদেরকে ধর্মীয় তালিম দিতেন। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সৈয়দ আতাউর রহমান চতৃর্থ। অন্য ভায়েরাও স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।   

সৈয়দ আতাউর রহমান কর্ম জীবনের শুরুতেই বৃটেন প্রবাসী ছিলেন। তার বড় ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমানের সাথে কিডিমিনিস্টার শহরে থাকতেন। ব্যবসায়িক কারণে চলে আসেন বার্মিংহাম শহরে। সেখানে তারা দুই ভাই মিলে বৃটেনে প্রথম হালাল মিট-চিকিনের ব্যবসা শুরু করেন। সৈয়দ আব্দুর রহমানকে বিবিসি‘র অনুসন্ধানী তথ্যে বৃটেনে প্রথম হালাল খাদ্যের আবিস্কারক উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ ব্যাপারে সৈয়দ আব্দুর রহমান বলেন, তার ছোট ভাই সৈয়দ আতাউর রহমানের হালালের প্রতি আকর্ষণ এবং হারামের প্রতি ঘৃণা থেকেই এই ব্যবসায় তারা আগ্রহী হন। ১৯৭১ সালের দিকে বার্মিংহামের বোলসালহিথ রোডের ১৪২ নাম্বার  ছিলো তাদের হালাল গোসারীর দোকান। 

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দোকানের উপর তলায় ছিলো বার্মিংহামে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের কেন্দ্র। তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরির সাথে সৈয়দ আব্দুর রহমান গোটা বৃটেন সফর করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গণজাগরণ ও অর্থ সংগ্রহ করেন। 

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ একশন কমিটির উদ্যোগে বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্কে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। এটা ছিলো বহির্বিশ্বে প্রথম খোলা আকাশে আমাদের জাতীয় পতাকা উড়ানো। সেই জনসভায় সাহসী সংগ্রামীদের মধ্যে সৈয়দ আব্দুর রহমান ও সৈয়দ আতাউর রহমান ছিলেন। সেদিন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানিদের আক্রমনে ১৩ জন বাংলাদেশী আহত হন। তবে শক্তভাবে হামলা কারিদের প্রতিরোধ করা হয়।

সৈয়দ আতাউর রহমান ‘একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’ এর একজন সদস্য ছিলেন। এই সংগঠন  মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বৃটেনে জনসমর্থন আদায় এবং অর্থ সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। জেনেভা থেকে ব্যারিস্টার নিয়োগ করতে তার বড় ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে ১৬শ পাউন্ড সংগ্রহ করে তৎকালিন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলামের সেক্রেটারী রেজাউর রহমানের কাছে প্রদান করা হয়। এই টাকা দিয়েই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য জেনেভা থেকে প্রথম ব্যারিস্টার নিয়োগ করা হয়। এরপর সৈয়দ আব্দুর রহমান সরাসরি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে ৫০৪ পাউন্ডের একটি চেক হস্তান্তর করেন। তৎকালিন বাংলার বাণী পত্রিকায় ছবি সহ এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। 

সৈয়দ শামসুদ্দিনের (র.) স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর একটি আধ্যাত্মিক চেতনা সমৃদ্ধ গ্রাম। বৃহত্তর সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও আলিম সমাজের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। অনেক কৃতি পুরুষের  জন্মভূমি।  এই গ্রামেই সৈয়দ আতাউর রহমানের জন্ম। যে গ্রামের আয়তন ১৫ মাইল ও জনসংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার। এই গ্রামে রয়েছে  ৭টি মৌজা ও ৬টি মহল্লা। আছে ৮টি জামে মসজিদ ও ৩০টি পাঞ্জেগানা মসজিদ, ২টি দাওরায়ে হাদীস মাদরাসা (১টি বালক, ১টি বালিকা), ১টি সরকারী মাদরাসা (আলিম), ১টি কলেজ,  ১টি হাই স্কুল,  ৫টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি কিন্ডার গার্ডেন, ৪টি নূরানী মক্তব, দারুল কুরআন হিফজখানা সহ অসংখ্য মক্তব। আছে পোষ্ট অফিস, ইউনিয়ন অফিস, ব্যাংকের শাখা, গ্রন্থাগার, ক্লিনিক, ক্রীড়া সংগঠন এবং বিশাল বাজার।  

সৈয়দ আতাউর রহমান এমন একটি ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানীর (র.) খলিফা মাওলানা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভীর (র.) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আর শায়খে বর্ণভীর (র.) হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমেই তিনি ইসলামী আন্দোলনের পথে যাত্রা শুরু করেন।  

শায়খে বর্ণভীর (র.) ইন্তেকালের পর তিনি শাহ জালালের (র.) দরগার ইমাম আরেফবিল্লাহ হাফেজ মাওলানা আকবর আলীর (র.) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি হাফেজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়ার (র.) সফর সঙ্গী হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। 

১৯৮১ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ ও আলেমে দ্বীন হজরত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের (র.) নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশ গ্রহন করেন। এরপর থেকে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে যান। তিনি খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শুরার সদস্য সহ সিলেট জেলা কমিটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। 

খেলাফত আন্দোলন থেকে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস গঠিত হলে তিনি প্রথমে সংগঠনের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি, তারপর নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। খেলাফত মজলিস দুভাগ হলে তিনি খেলাফত মজলিস (ইসহাক-কাদের) গ্রুপে জেলার দায়িত্ব, কেন্দ্রীয় শুরার সদস্য এবং কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন। 

সৈয়দ আতাউর রহমান এনজিওদের অপতৎপরতা ও নাস্তিক মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলনে সিলেট জেলা শাখার যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এই আন্দোলনে সভাপতি ছিলেন জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান (র.)। 

আশির দশকে সিলেটের অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে গঠিত মুজাহিদ কমিটির তিনি ছিলেন সহ-সভাপতি। তখন সভাপতি ছিলেন খলিফায়ে মাদানী হাফেজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.)। 

সৈয়দ আতাউর রহমান জামেয়া কাসিমূল উলূম (দরগাহ মাদরাসা), জামেয়া নুরিয়া ভার্থখলা মাদরাসা, জামেয়া আরাবীয়া রানাপিং মাদরাসা সহ বৃহত্তর সিলেটের অসংখ্য মাদরাসার কার্যকরি কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন তিনি বৃহত্তর সিলেটের কাওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ‘আজাদ দ্বীনী এদারায়ে তালিম বাংলাদেশ’ এর কার্যকরি কমিটির সদস্যও ছিলেন। 

বৃটেনে সৈয়দপুর শামসিয়া সমিতির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ সালে তার প্রচেষ্টায় সৈয়দপুর গ্রামে শাহ সৈয়দ শামসুদ্দিন জামেয়া ইসলামিয়া হাফিজিয়া দারুল হাদিস বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদরাসার জন্য তিনি এবং তার ভায়েরা নিজ বাড়ীর কিছু অংশ এবং ছয় কেদার ক্ষেতের জমি ওয়াকফ করে দেন। বৃটেনের বার্মিংহাম শহরে প্রতিষ্ঠিত আল-আমিন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এটি বর্তমানে বার্মিংহামের প্রসিদ্ধ আল-আমিন প্রাইমারী এবং আল-আমিন জুনিয়র স্কুল হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। 

সৈয়দ আতাউর রহমান ১৯৬৮ সালে সিলেটী নাগরি ভাষার মহাকবি পির মজির উদ্দিনের ছেলে মরমী কবি পির মনফর উদ্দিনের বড় মেয়ে এবং বিশিষ্ট কবি অধ্যাপক ফরীদ আহমদ রেজার বড়বোন বেগম ফৌজিয়া কামালকে বিয়ে করেন । বেগম ফৌজিয়া কামাল যেমন সুন্দরী, তেমনী মেধাবী ছিলেন। কৈশোরে তার কবিতা আমীনূর রশীদ চৌধূরী কর্তৃক সম্পাদিত এবং প্রকাশিত তৎকালিন যুগভেরী পত্রিকা এবং মুহাম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত আল ইসলাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। 

সৈয়দ আতাউর রহমানের চার ছেলে এবং চার মেয়ে। বড় ছেলে  কবি ও গবেষক সৈয়দ মবনু, দ্বিতীয় ছেলে জনপ্রিয় টিভি সাংবাদিক ও বার্মিংহাম থেকে প্রকাশিত বাংলা ভয়েস পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদ, তৃতীয় সৈয়দ ফখর উদ্দিন এবং চতুর্থ সৈয়দ সফির আহমদ। মেয়েরা হলেন, সৈয়দা সফুয়ানা বেগম শেফা, স্বামী হাফিজ মাওলানা সৈয়দ কফিল আহমদ। সৈয়দা তাসলিমা বেগম লিমা, স্বামী মাওলানা অধ্যাপক আব্দুল কাদির সালেহ। সৈয়দা তাহরিমা বেগম, স্বামী আব্দুল মোনাইম খান শাহান। কবি সৈয়দা তানজিনা বেগম, স্বামী সৈয়দ রিয়াদ আহমদ। 

সৈয়দ আতাউর রহমান আমৃত্যু ভালো কাজ করে গেছেন। মহৎ কাজে দু‘হাতে দান করেছেন। ইসলামের কালোত্তীর্ণ বানী মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সমাজ গড়ার জন্য আজীবন সাধনা করেছেন।  অনন্য সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পতাকা তলে সঙ্গবদ্ধ ছিলেন। সমাজিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নিজে একটি আদর্শ পরিবারের উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। 

মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।