সৈয়দ ফারুকের জন্য দোয়ার আহবান

সৈয়দ ফারুকের জন্য দোয়ার আহবান

সাঈদ চৌধুরী

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন‌ জনপ্রিয় রাজনীতিক ও সাংবাদিক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক। খবরটি তার অনেক প্রিয়জনের মত আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয়েছে আমাদের কমিউনিটিতে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুক একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিক, নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী ও সচেতন সাংবাদিক। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাল আমলে নির্লোভ-নিরহঙ্কার সাদা মনের মানুষ খুব বেশী নেই। হাতে গুনা যে ক‘জন ছিলেন তার মধ্যে জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের সুযোগ্য সন্তান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডন প্রবাসী ছিলেন। তারই সার্থক উত্তরাধিকারী সৈয়দ ফারুকও একজন প্রবাসী। 

২০০০ সালের ২৬ জানুয়ারি আমি বিলেত এসেছি। পরের দিন ২৭ জানুয়ারি ছুটে গেছি সাপ্তাহিক নতুন দিন অফিসে। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও নতুন দিন সম্পাদক মহিব চৌধুরী যখন আমাকে স্বাগত জানালেন, তখন সেখানে ছিলেন সহকারী সম্পাদক ও বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ ফারুক। আরো উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাসন, নতুন দিনের নির্বাহী সম্পাদক বর্তমানে জনমতের সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা, সহ সম্পাদক ও রেডিও প্রেজেন্টার মিসবাহ জামাল, বার্তা সম্পাদক আখলাকুল ইসলাম বাদল, সহ-বার্তা সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল কাদির, হেড অব প্রডাকশন ও সদ্য সাবেক সুরমা সম্পাদক আহমদ ময়েজ প্রমুখ। 

এই দিনটি বিলেতের জীবনে আমার কাছে বেশ স্মরণীয়। নতুন দিন পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা আমাকে বরণ করে নিলেন। একই সাথে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবেও আমাকে সংযুক্ত করে নেন। অবশ্য নতুন দিনে আমার অনেক লেখা আগেও প্রকাশিত হয়েছে। নতুন দিন সম্পাদকের বড় ভাই সিলেটের বরেণ্য সাহিত্যিক, সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী পাঠাতেন। আমি তখন সংলাপের সেক্রেটারি জেনারেল এবং জাতীয় দৈনিকে কাজ করি। আমার লন্ডন আসার পূর্বেই কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী নতুন দিনে আমার নিয়োগ নিশ্চিত করেছেন।

সাপ্তাহিক নতুন দিন বৃহস্পতিবার মার্কেটে আসে। মূল কাজ হয় মঙ্গল ও বুধবার। সৈয়দ ফারুক এই দু’দিন থাকেন। আমরা এক সাথে কাজ করি। প্রথম পাতা সাজাতে গিয়ে লীড ও সেকেন্ড লীড নিয়ে মাঝে মাঝে আমাদের ভিন্নমত হয়। আমি রাজনীতির মানুষ নই। সৈয়দ ফারুক রাজনীতি করেন। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার রাজনীতি প্রাধান্য পেতেই পারে। মহিব চৌধুরী উভয়কে খুশি রেখে চমৎকার সমাধান দিতেন। আমরা সবাই মুগ্ধ হতাম। তবে একটি ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় ছিল, সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশার মানুষের রাজনীতি সম্পৃক্ততা দেখেছি। সৈয়দ ফারুকের মত দলের প্রতি আনুগত্য, কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সহকর্মিদের প্রতি আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কম দেখেছি। 

সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত নতুন দিনে আমরা এক সাথে কাজ করেছি। পরবর্তী সময়েও যখনই সামাজিক কোন প্রয়োজনে দেখা সাক্ষাত হয়, সৈয়দ ফারুক প্রাণখোলা ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে আসেন। আমার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে ২০০৩ সালে ‘ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরি‘, ২০০৭ সালে ‘ইউকে এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি‘ এবং ২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড ডাইরেক্টরি ‘মুসলিম ইনডেক্স‘ প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি আমাকে অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনা যুগিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখর মেধাবী ছাত্র সৈয়দ ফারুক ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছিলেন লড়াকু সৈনিক। পরিস্থিতির মারাত্বক অবনতি হলে মরহুম আব্দুর রাজ্জাকের সহায়তায় তিনি বিলেত চলে আসেন। এখান থেকে হাইকমিশনের মাধ্যমে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সফল হন। লন্ডনে তিনি আইন বিষয়ে হলবন ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করেছেন। তবে ল‘ শেষ না করে শিক্ষকতায় প্রফেশনাল ট্রেনিং  পিজিসি করে নেন গ্রিনিচ ইউনিভার্সিটি থেকে। তারপর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন সুনামের সাথে। 

সৈয়দ ফারুক গত ৮ বছর ধরে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে যুগ্ম সম্পাদক এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সৈয়দ ফারুক যুক্তরাজ্যে থাকলেও জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জের মানুষের সাথে রয়েছে তাঁর আত্মার সম্পর্ক। এলাকাবাসীর সুখে দুঃখে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। সুযোগ পেলেই ছুটে যান এলাকায়। সাধ্যমত চেষ্টা করেন সহযোগিতার। স্থানীয় দাবিদাবা সহ ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থেকে গ্রামীন জনপদের উন্নয়নে তিনি সবসময় সোচ্চার।

সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়নকালীন ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন সৈয়দ ফারুক। তখন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে সংগঠনের মিছিল, সভা-সমাবেশে যোগদান ছাড়াও কলেজ এবং সিলেটের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রলীগের কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে সে সময় নিরলশ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। 

১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যখন দুঃসময়, সেই সময়ে সৈয়দ ফারুকের সাহসী ভূমিকা ছিলো প্রশংসনীয়। ৮০র দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রলীগের কেন্ত্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন।

ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশে গণতন্ত্র হুমকীর মুখে পড়লে বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনাকে দেশে যেতে বাঁধা দেয় তত্বাবধায়ক সরকার। তখন সৈয়দ ফারুক সহ শতাধিক নেতাকর্মী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশে যান। সেখানে তিনি গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।

সৈয়দপুরের সমাজসেবী সৈয়দ ইউনুস আলীর ৭ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সকলের ছোট  সৈয়দ ফারুক। ছেলে বেলা থেকেই তিনি বেশ সৌখিন ও প্রাণ-উদ্দীপ্ত। বিয়ে করেছেন নিজ গ্রামের স্বনামধন্য রাজনীতিক সৈয়দ আব্দুল হান্নানের কন্যা সিলেট মহিলা কলেজের সাবেক জিএস সৈয়দা রেখা বেগমকে। তাদের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। সকলেই অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যয়ন রত।
 
মানব কল্যাণে ব্রত সৈয়দ ফারুক সব সময় এলাকার মানুষকে সার্বিক সহায়তা করেন। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগকে নিয়ে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুক সুবিধাবঞ্চিত লোকজনের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন। নিজ জন্মভূমি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার হতদরিদ্র ৫ শতাধিক লোকজনের মধ্যে এ শীতবস্ত্র তুলে দেন। এবার বেদে সম্প্রদায়, হরিজন সম্প্রদায় সহ সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র হিসেবে একটি করে প্রায় ৫শতাধিক মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়। উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় কম্বলগুলো বিতরণ করা হয়েছে। 

এই কিছু দিন আগে সৈয়দ ফারুক প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি কর্মহীন খেটে খাওয়া অসহায় দরিদ্রদের মানবিক সহায়তার আহবান জানিয়েছেন। তার ফেইসবুক আইডিতে দেয়া বার্তায় জানান, দেশ বিদেশে অবস্থানরত ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, সহযোদ্ধা, শুভার্থী, শুভানুধ্যায়ীরা কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ আতঙ্কগ্রস্থ।  প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, আমরা হারাচ্ছি অনেক মানুষকে। ইতোমধ্যে আমরা আমাদের অনেক পরিচিত জন ও আপনজনকে হারিয়েছি। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে ঘরে থাকতে হবে। বার বার সাবান পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। যতদূর পারা যায় অবশ্যই জনসমাগম এড়িয়ে চলা উচিত। সবসময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।

সৈয়দ ফারুক আরো উল্লেখ করেন, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বের মত দু:সময় পার করছে। দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ এই সময়ে কর্মহীন। সমাজের বিত্তশালী যারা আছেন, আমরা যেনো আমাদের আশপাশের এসব মানুষের পাশে দাঁড়াই। ইতোমধ্যে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশের লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আসুন সরকারের পাশাপাশি আমরাও আমাদের আশপাশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। ঘরে থাকুন, নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান, সমাজকে বাঁচান, দেশকে বাঁচান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন।

এমন একজন সুন্দর মনের মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার খবরে জনমনে উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দ ফারুকের রোগ মুক্তির জন্য সবার দোয়া চাই। মহান আল্লাহ তাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন।