ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন সাগরে  ছুড়ে ফেলেছিলেন শহিদুল আলম

ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন সাগরে  ছুড়ে ফেলেছিলেন শহিদুল আলম

তাইসির মাহমুদ

'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা' নৌবহরের জাহাজে চড়ে গাজা অভিমুখে দুঃসাহসিক যাত্রার বর্ণনা দিচ্ছিলেন আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ফটো জার্নালিস্ট  ড. শহিদুল আলম। 
বললেন, তাদের বহনকারী নৌবহরের জাহাজটি যখন গাজা উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছতে যাচ্ছিলো তখনই ইসরাইলী বাহিনী হেলিকপ্টারে চড়ে এসে তাদের নৌবহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় । 

হেলিকপ্টার যখন জাহাজের কাছাকাছি চলে আসছিলো তখনই তিনি তার সঙ্গে থাকা ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন সাগরে ছুড়ে ফেলেন। যদিও সেটা ছিলো খুবই কষ্টের, কিন্ত এছাড়া উপায় ছিলো না। কারণ ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনে অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গের সাথে ম্যাসেজ আদান প্রদানের রেকর্ড ও গুরুত্বপুর্ণ ডকুমেন্টস ছিলো । তারা এসব পেয়ে গেলে মিথ্যা মামলায় জড়াতে পারে। 

কিন্ত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনটি সাগরে ফেলে দিয়েও রক্ষা হয়নি। তাদের বহরের ৫০ জনেরও বেশি মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় । ইসরায়েলের  মরুভূমির মধ্যখানে একটি জেলখানায় বন্দী করে রাখা হয়। 

তাদেরকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। যাতে লেখা ছিলো, তারা অবৈধভাবে ইসরাইলে প্রবেশ করেছেন। তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান । বলেন, আমি অবৈধভাবে প্রবেশ করিনি, বরং তোমরাই আমাদের অবৈধভাবে নিয়ে এসেছো ।
 
এরপর অনেক কথা কাটাকাটির পর তারা সেটি পরিবর্তন করে নিয়ে আসে। এরপর তিনি স্বাক্ষর করেন। বাহাত্তর ঘন্টা পর তিনিসহ অন্যদের মুক্তি দেওয়া হয়। 
তিনি বলেন, আটক হওয়ার পরই দেশে বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।  প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বিবৃতি দেন । সবকিছু মিলিয়ে তারা তাকে আটকে রাখার সাহস করতে পারেনি। 

তিনি বলেন, যখনই আপনি প্রতিবাদ করবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন- তখনই নিপীড়ক দুর্বল হয়ে পড়বে । আপনি ভয় পেয়ে গেলেই সে আপনার ওপর চড়াও হয়ে  যাবে। সুতরাং প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে । প্রতিবাদের বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর ২০২৫) সকালে পুর্ব লন্ডনের একটি অফিসে কথা বলছিলাম ড. শহিদুল আলমের সাথে। খুবই দৃঢ়চেতা একজন মানুষ। তাঁর পোশাক-আশাক, চলফেরা একেবারেই সাদামাটা। 

ওইদিন বিকেলে বৃটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে তিনি বলেন, আমি আসলে ওই প্রধান অতিথি কিংবা বিশেষ অতিথির কাঠামোর মধ্যে থাকতে পছন্দ করিনা। সাধারণ মানুষের মতো থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি। 

উল্লেখ্য, 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা' হচ্ছে একটি বিশাল নৌবহর। যেখানে প্রায় ৪০টিরও বেশি জাহাজ ও নৌকা অংশ নেয় এবং এসব জাহাজে ৪৪টির বেশি দেশের প্রায় ৫০০ কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যোগ দেন । জাহাজগুলোতে মূলত খাদ্য, ওষুধ, পানি ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী ছিলো। তাদের উদ্দেশ্য, গাজায় জরুরি সহায়তা পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক সমাজকে অবরুদ্ধ মানুষের মানবিক সংকটের দিকে নজর দিতে বাধ্য করা।

সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে স্পেনের বার্সেলোনা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে এই নৌবহর । এরপর ইতালি ও তিউনিশিয়া বন্দর থেকে আরও কিছু জাহাজ এতে যোগ দেয় । কিন্তু যাত্রাপথে এই নৌবহরকে বারবার বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে ইসরাইল। ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে সব বাঁধা অতিক্রম করে প্রায় এক মাসের যাত্রা শেষে ফ্লোটিলার কিছু জাহাজ ১ অক্টোবর বুধবার গাজার কাছাকাছি পৌঁছায়।
 এরপরই ইসরাইলি নৌবাহিনী জাহাজগুলোতে হামলা চালায় এবং জব্দ করতে শুরু করে। ৪০টিরও বেশি জাহাজ আটক করে নিয়ে যায় ।