জাতীয় ঐক্যের স্বপ্ন ও বাস্তবতা”
জাতীয় ঐক্য জোর করে গঠন করা যায় না—
এটি গড়ে ওঠে বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে। আবার কখনো গড়ে ওঠে অত্যাচারী শাসক নির্যাতনের চরম পর্যায়ে উপনীত হলে দেশের সাধারণ জনগণ দল মত নির্বিশেষে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে মৃত্যুর ভয়কে অপেক্ষা করে গণবিপ্লব ঘটিয়ে জাতীয় ঐক্যের কৌটায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
আবার অনেক বিশেষজ্ঞদের— মতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “জাতীয় ঐক্য” এমন এক শব্দ যা প্রায় প্রতিটি যুগে বারবার উচ্চারিত হয়েছে—বিপ্লব, নির্বাচন, বা রাষ্ট্রীয় সংকটের সময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঐক্য কি বাস্তবে কোনো জাতীয় শক্তিতে রূপ নিচ্ছে, নাকি এটি কেবলমাত্র বক্তৃতার মঞ্চে, রাজনৈতিক প্রচারণার ব্যানারে, কিংবা টকশোর আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ একটি স্লোগান।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত গণবিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার প্রায় সকলই কোনো না কোনো জাতীয় নেতার আহ্বানে সংঘটিত হয়েছে।
যেমন- ১৯৭৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি-র নেতৃত্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সফলতা লাভ করে। বিপ্লবের পর এপ্রিল, ১৯৭৯ একটি গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়, এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
কিউবার ফিডেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবী বাহিনী ১লা জানুয়ারী, ১৯৫৯ সালে রাজধানী হাভানায় প্রবেশ করে এবং কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার সরকারের পতন নিশ্চিত হয়। ১ জানুয়ারির ১৯৬৯ সাল কিউবার বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণবিপ্লব ছিল এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য ঘটনা—একটি নেতাহীন বিপ্লব, যা নিজস্ব শক্তিতে সফলতা অর্জন করেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে সুদভিত্তিক শোষণমূলক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জাতি মুক্তি লাভ করলেও, এখনো জাতির কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ নিতে পারছেনা।
জাতীয় ঐক্য হলো একটি দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে একতা, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের গভীর অনুভূতি।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী দুঃশাসন অবসান ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে—যে বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থান পেয়েছে। এটি ছিল এমন এক গনবিপ্লব, যার পরিণতিতে জাতীয় সংসদের ৩০০ জন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, সচিব, উপসচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা দলীয় নেতা এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিব ও বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত দেশছেড়ে পালিয়েছে নিজেদের অপকর্মের জন্য।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি শুধু একটি শাসনব্যবস্থার পতন নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের শক্তি ও জনগণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
আমরা প্রত্যক্ষ করেছি—জুলাই বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ রূপদিতে ছাত্র সমন্বয়কদের প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রপতি, সংবিধান, সেনাপ্রধান পরিবর্তন করে জাতীয় ঐক্যমতের সরকার গঠনের জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর বিমাতা ষোলভ আচরণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমনকি সর্বোপরি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম মতপার্থক্য এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে।
আমাদের জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রধান হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো,
বর্তমান বাংলাদেশে রাজনীতি মূলতই ক্ষমতা কেন্দ্রিক। প্রতিটি দল “জাতীয় স্বার্থ” বা “জনগণের ঐক্য”র কথা বললেও, তাদের অবস্থান এবং কার্যকলাপ অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের পরিপন্থী। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা, মতভেদকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করা, এবং জনগণকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্ত করা—এসবই জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে দুর্বল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও দেখা গেছে, নেতৃত্বহীন জনআন্দোলন নতুন এক ঐক্যের বার্তা দিলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে। ফলে ঐক্যের যে স্বতঃস্ফূর্ত স্রোত তৈরি হয়েছিল, তা রাজনীতির কৌশলগত জালে আটকে পড়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে সামাজিক ঐক্যের ঘাটতি
জাতীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ঐক্যের ভিত্তিতেও নির্ভর করে। আজ সমাজে বিভাজন গভীর—ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষা-বঞ্চিত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। এক শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী, অন্য শ্রেণি বঞ্চনার শিকার। এমন বৈষম্যের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান অনেক সময় শূন্য শব্দের মতোই শোনায়।
তৃতীয়ত্ব ধর্মীয় বিভাজনও আজ বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের জন্য একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব, আকিদাগত মতপার্থক্য, পীর-মুর্শিদের অনুসারী বিভিন্ন দল, শিয়া-সুন্নি ও আহলে হাদীসের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি—এসবের ফলে সমাজে নানা উপদল ও মতগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। শহর ও গ্রামীণ পর্যায়ে এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করা এখন এক সহজ কৌশলে পরিণত হয়েছে, যা জাতীয় ঐক্যের পথে বড় প্রতিবন্ধক।
তাছাড়া সাম্প্রতিক আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছে বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তী কালীন সরকারকে নিয়ে।
গত ১৫ মাসের সরকারের উপদেষ্টদের দায়িত্বে থাকা দেশপ্রেম, এবং দেশের সার্বভৌমত্ব প্রতি অনুগত্য প্রদর্শনের প্রশ্নে! উপদেষ্টাদ অনেকেই ডাবল স্ট্যান্ডার মেনে চলছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক আলোচনায় আসছে উপদেষ্টাদের দুর্নীতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, অপরাধ দমনে ব্যর্থতা, প্রভাবশালী চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের safe exit করে দেওয়া ইত্যাদি বহুবিধ কারণেই আস্থা হীনতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
দীর্ঘদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র যে বিষয়টি বারবার ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে, তা হলো—ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মার আস্ফালন এখনো প্রতিহত করা যায়নি। প্রশাসনের নানান স্তর ও রন্ধ্রে তারা অত্যন্ত কৌশল এবং যত্ন সহকারে বিপ্লবের চেতনাকে দমন ও নিবৃত্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কারো কারো মতে, বিদেশি হস্তক্ষেপ—বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কলকাঠি নাড়ছেন। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ-বিরোধী অপপ্রচার’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরোক্ষ হস্তক্ষেপ’ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশ্বাস করা হয়, পলাতক বিগত সরকারের কিছু মন্ত্রী ও নেতারা পূর্বে পাচার করা বিপুল অর্থের জোরে কলকাতা ও আশপাশের রাজ্যগুলোতে অবস্থান নিয়ে বারবার জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট ও দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশে “জাতীয় ঐক্য” এখন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়—এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্থিতি ও ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। আজ রাষ্ট্র যে চ্যালেঞ্জের মুখে—প্রশাসনিক অনৈতিকতা, সামাজিক বিভাজন, ধর্মীয় মেরুকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়—সেগুলো মোকাবিলায় কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে একা লড়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সর্বজনীন ঐক্য, যা মতাদর্শ নয়, আদর্শের ভিত্তিতে দাঁড়াবে। নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই রাজনীতির লক্ষ্য নয়; বরং জনগণের আস্থা অর্জনই টেকসই রাজনীতির ভিত্তি।
যদি নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণ একসাথে এই নৈতিক ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে জাতি তার হারানো আস্থা, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের পথ ফিরে পাবে। কিন্তু যদি বিভাজনের রাজনীতি, অবিশ্বাস ও স্বার্থপরতার সংস্কৃতি চলতে থাকে, তবে “জাতীয় ঐক্য” শব্দটি রয়ে যাবে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অলঙ্কার হিসেবে—আর বাস্তবে জাতি ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হবে বিভাজনের অন্ধকারে, যেখানে রাষ্ট্র থাকবে অস্তিত্ব সংকটে, আর জনগণ থাকবে দিকহারা ভবিষ্যতের অপেক্ষায়।
মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
নিউইয়র্ক।


