পান্তা-ইলিশে উচ্ছ্বাস, ফুটপাতে ক্ষুধার দীর্ঘশ্বাস
সুবর্ণা হামিদ
বাংলা নববর্ষ মানেই পান্তা-ইলিশ—আনন্দ, ঐতিহ্য আর উদযাপনের এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু এই উৎসবের দিনেই সমাজের এক বড় অংশের মানুষের কাছে পান্তা-ইলিশ কেবলই অধরা এক স্বপ্ন হয়ে থাকে। এতিম শিশু, পথশিশু, ফুল বিক্রেতা কিংবা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের জীবনে এই ঐতিহ্যের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, যেখানে রেস্তোরাঁগুলোতে পান্তা-ইলিশের আয়োজন চলছে জাঁকজমকভাবে, ঠিক সেখানেই রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে শিশু-কিশোররা। নববর্ষের দিনেও তাদের ব্যস্ততা—কেউ গোলাপ বিক্রি করছে, কেউ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে।
চৌহাট্টা এলাকায় ফুল বিক্রি করা ১২ বছরের রাহিম (ছদ্মনাম) জানান-সারাদিন ফুল বিক্রি করি। পান্তা-ইলিশ খাওয়া হয় না, কখনো কখনো ভাত আর ডাল পেলেই ভালো লাগে। একইভাবে এক এতিমখানার শিশুদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, তাদের নববর্ষের খাবার সাধারণ দিনের মতোই—ডাল-ভাত কিংবা খিচুড়ি।
নগরীর একটি এতিমখানার দায়িত্বশীল ব্যক্তি হোসাইন বলেন- আমরা চেষ্টা করি বিশেষ দিনে একটু ভালো খাবার দিতে, কিন্তু ইলিশ মাছ কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। খরচ অনেক বেশি।
অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল পরিবারের অনেকেই নববর্ষে পান্তা-ইলিশের ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। কিন্তু সেই ছবির বাইরের বাস্তবতা অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. ওয়াসিম বলেন, পান্তা-ইলিশের মূল দর্শন ছিল সরলতা, সংযম ও সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি সামষ্টিক উৎসব গড়ে তোলা। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য অনেক ক্ষেত্রেই তার মৌলিক চেতনা হারিয়ে এখন প্রদর্শনী কিংবা সামর্থ্য দেখানোর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, নববর্ষের দিনে শহরের এক পাশে যখন রঙিন আয়োজন, ব্যয়বহুল উৎসব আর সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাসের ঢেউ, অন্য পাশে তখনও অসংখ্য মানুষ লড়ছে নিত্যদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামে। এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
তার ভাষায়, প্রান্তিক মানুষের কাছে পান্তা-ইলিশ কোনো উৎসবের খাবার নয়, বরং দূর থেকে দেখা এক বিলাসিতা—যার সঙ্গে তাদের জীবনের কোনো বাস্তব সংযোগ নেই।
তিনি আরও যোগ করেন, এই ব্যবধান কমাতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং দরকার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং এমন উদ্যোগ, যা সত্যিকার অর্থে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।
এ বিষয়ে খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ নেওয়াজ বলেন-নববর্ষের মতো একটি সর্বজনীন উৎসব তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে এর আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এই দিনটি অন্য দিনের মতোই থেকে যায়।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা পান্তা-ইলিশ কী, তা কেবল গল্পে বা অন্যের মুখে শুনেছে—নিজেদের জীবনে সেই অভিজ্ঞতা নেই। এতে একধরনের অদৃশ্য বঞ্চনা তৈরি হয়, যা তাদের মানসিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সচেতন মানুষেরা একসঙ্গে এগিয়ে এলে অন্তত বিশেষ দিনগুলোতে এসব শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব। ছোট ছোট উদ্যোগই পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। একটি ঐতিহ্য যখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা তার সামষ্টিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাহমিনা ইসলাম বলেন- সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে উৎসবের আনন্দে সম্পৃক্ত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ ও আন্তরিক সহমর্মিতা। শুধু ব্যক্তি পর্যায় নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সচ্ছল শ্রেণির মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, পান্তা-ইলিশ কেবল একটি খাবার নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই আনন্দ যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জীবনে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।


