গণতন্ত্রের মুখোমুখি বাংলাদেশ: নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা বিশ্বাসযোগ্য!
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই আস্থা সংকটে ভুগছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবতায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে প্রশাসনের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করছে।
সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনীয় দায়িত্বে যাঁরা কাজ করবেন—তাঁদের বড় অংশই বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিপ্লবী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এই প্রশাসনিক কাঠামোয় দৃশ্যমান কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এরই মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রশ্ন সামনে এসেছে—সেনাপ্রধান, উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল সহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সঙ্গে বিএনপির হাই কমান্ডের কোনো ধরনের রাজনৈতিক লিয়াজোঁ বা সমঝোতা রয়েছে বলে কোন কোন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ পোষণ করছেন।
এই প্রশ্নের পেছনে কয়েকটি ঘটনা জনআলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষ করে দেশের দুটি প্রভাবশালী ও বিতর্কিত সংবাদপত্র—ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো—এর সম্পাদক দ্বয়ের বিএনপির পাশে দাঁড়ানো। সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করে বিএনপির নমিনেশন নেওয়া এগুলো সমালোচনা ও প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত।
অতি সম্প্রতি শহিদ ওসমান হাদীর ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকা জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে হামলা কারীদের গ্রেপ্তার করা হলেও, শহিদ ওসমান হাদীকে গুলি করা ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের এখনো গ্রেপ্তার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হত্যা কারীকে গ্রেফতারের জন্য দিনের পর দিন শাহবাগে প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চাপ সত্ত্বেও প্রশাসনের কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসন অদৃশ্য শক্তির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যদি চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে সেই প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজ এসে দাঁড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ভাষণে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল—একজন বিশ্বস্বীকৃত নোবেল লরিয়েটের নেতৃত্বে বাংলাদেশ হয়তো নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে। নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে ড. ইউনূসের ওপর যে প্রত্যাশার পাহাড় তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব।
কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অভিযোগ উঠছে, তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তি ও গন-আন্দোলনের সম্মিলিত ভূমিকাকে পাশ কাটিয়ে ছাত্র সমাজকে একক কৃতিত্ব দেওয়ার! একই সঙ্গে সেনাপ্রধানকে অতিরিক্ত বীরত্বের মুকুট পরিয়ে পুরো বিপ্লবী চেতনার ভারসাম্য নষ্ট করেছেন বলে অনেকে মনে করছেন। এতে করে গণ-আন্দোলন ও বহুমাত্রিক ত্যাগের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এই কারণে যে, জনগণের মতামত ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থায় ফাটল ধরেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে সরকার গণআকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা কি ধীরে ধীরে সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাচ্ছে? ড. ইউনূসের নেতৃত্ব যদি সত্যিই ইতিহাসের সামনে বিশ্বাসযোগ্য হতে চায়, তবে তাকে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি প্রভাব নয়—জনগণের মতামত, জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, এই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর যে আস্থা দিয়ে মানুষ আশা বুনেছিল, তা গভীর হতাশায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ডঃ ইউনুস যে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন নিয়ে জাতি সন্দেহ পোষণ করছে।
তবুও আশার জায়গা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষণীয়—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন সমঝোতা বা সমমনা অবস্থানের ভিত্তিতে মোট প্রায় ১২টি রাজনৈতিক সংগঠন বা ছোট দল এর সঙ্গে যৌথ নির্বাচনের ঘোষণা মাধ্যমিক কার্যক্রম শুরু করেছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার আলাদাভাবে নিজেদের অবস্থান ও কৌশল স্পষ্ট করেছে। জামায়াতে ইসলামী ও এন,সি,পি
এবং ইসলামী সমমান দশটি দল নিয়ে জোট আসন বন্টনের মাধ্যমে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। এই পৃথক সাংগঠনিক প্রস্তুতি নির্বাচনকে ঘিরে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে বলে অনেকের ধারণা।
জনমনে বিশ্বাস জন্মাচ্ছে যে, এবার ভোটকেন্দ্র দখল, সন্ত্রাসী তৎপরতা কিংবা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকার প্রবণতা থাকবে না। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ জনগণও আরও বেশি সজাগ ও প্রতিরোধী ভূমিকা পালন করবে। অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে শিখিয়েছে—নীরবতা অন্যায়ের শক্তি বাড়ায়, আর সচেতন উপস্থিতি অনিয়মের জায়গা সংকুচিত করে।
বিশেষ করে ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক পাহারা, অনিয়মের তথ্য দ্রুত প্রকাশ, সামাজিক ও গণমাধ্যমে চাপ সৃষ্টি এবং জনমতের শক্ত অবস্থান প্রশাসনকেও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করতে পারে। যদি জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস ও কারচুপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা সহজ হবে না।
অতএব, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না—এটি নির্ভর করবে জনগণের জাগ্রত ভূমিকা, রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সম্মিলিত প্রতিরোধের ওপর। এই সচেতনতা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে সকল প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও একটি তুলনামূলক অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সমান মাঠের অভাব এবং জনআস্থার সংকট মিলিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল আনুষ্ঠানিক নির্বাচন আয়োজন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তা আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে।
গণতন্ত্র টিকে থাকে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আস্থার ওপর। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং সব রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোটাধিকার রক্ষায় জনগণের সচেতন ও সাহসী ভূমিকা অপরিহার্য।
মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ
কলামিস্ট,নিউইয়র্ক,


