সিলেটে ছড়িয়ে পড়ছে স্কেবিস: তীব্র চুলকানিতে ভুগছে নারী-শিশুসহ হাজারো মানুষ
সুবর্ণা হামিদ
সিলেট অঞ্চলে আবারও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ স্কেবিস (Scabies)। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি ক্লিনিক—সব জায়গাতেই এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা তীব্র চুলকানি, ত্বকে ফুসকুড়ি ও ঘায়ের সমস্যায় ভুগে প্রতিদিনই চিকিৎসা নিচ্ছেন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত একাধিক এলাকায় একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন।
দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকে সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ায় রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চর্মরোগী রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। শীত মৌসুম ঘনিয়ে আসায় স্কেবিসের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে নগরের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক পরিবারে আক্রান্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা না থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। ত্বকে ঘা, রক্তপাত ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ভুক্তভোগীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। সাধারণ মানুষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার অভাবে অজান্তেই রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন একে অপরের মধ্যে।
এ বিষয়ে স্কুলছাত্রী লিজা বেগম বলেন—গত কয়েকদিন ধরে হাতের তীব্র চুলকানিতে ভুগছি। শুরুতে ভেবেছিলাম সাধারণ সমস্যা, কিন্তু এখন ত্বকে ফুসকুড়ি আর ঘা হয়ে গেছে। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারিনি, এমনকি স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গেও মিশতে ভয় লাগে। রাতে চুলকানির কারণে ঘুম হয় না, পড়াশোনাতেও মনোযোগ দিতে পারি না। দিন দিন অবস্থার অবনতি হওয়ায় এখন ভীষণ কষ্ট আর অস্বস্তিতে সময় কাটছে।
এ বিষয়ে সিলেটের বাগবাড়ি এলাকার গৃহবধূ নাজমা বেগম বলেন-দীর্ঘদিন ধরে আমার দুই হাতে এই সমস্যা চলছে। অনেক ডাক্তার দেখালেও তেমন উন্নতি হয়নি। এখন সবচেয়ে ভয় লাগে— আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের যেন এই রোগ না ছোঁয়।
তিনি আরও বলেন- আগে ভাবতাম এটা ত্বকের সামান্য সমস্যা, কিন্তু এখন বুঝছি এটা আরও গভীর কিছু। দিন দিন হাতের অবস্থা খারাপ হচ্ছে, কাজ করতেও কষ্ট হয়।
স্কেবিসে আক্রান্ত এক গৃহবধূ রোকেয়া বেগম জানান- প্রথমে তিনি সাধারণ চুলকানি ভেবে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে মলম ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। পরে ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করলে ধীরে ধীরে উপশম পান। তিনি বলেন-এখন পুরো পরিবার একসঙ্গে ওষুধ ব্যবহার করছি, ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছি।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সিলেটের অনেক চিকিৎসকও এ রোগে ভুগছেন। চিকিৎসা দিতে দিতে তারাই এখন রোগের শিকার হয়ে পড়ছেন, যা বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এ বিষয়ে সিলেটের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. ওয়াজিমা চৌধুরী বলেন— আমি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে আমার মাথার পুরো অংশে স্কেবিস ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন নানা ধরনের রোগী আমার চেম্বারে আসেন, সম্ভবত তাদের কারও কাছ থেকেই সংক্রমিত হয়েছি, কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। চুলকানির কারণে রাতভর ঘুমাতে পারি না, যা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ কষ্টদায়ক। নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করলেও পুরোপুরি আরাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়া খুবই জরুরি।
এ বিষয়ে সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (ত্বক ও যৌনরোগ) ডা. ফারজানা ইয়াসমিন সুমা বলেন—বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে স্কেবিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সিলেটের নানা জায়গায় এবং নানা বয়সের মানুষের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে স্কুল ও মাদ্রাসায় এই রোগের প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন—স্কেবিস বা চুলকানি রোগকে অনেকেই স্বাভাবিক সমস্যা মনে করেন, কিন্তু অবহেলা করলে এটি দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে। এটি একটি সংক্রামক ত্বকের রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা বা ব্যবহৃত জামাকাপড়, বিছানাপত্র, তোয়ালে ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। তাই কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং নিকট সংস্পর্শে থাকা সবাইকে সচেতন হতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্ন থাকা, কাপড় ও বিছানার চাদর রোদে শুকানো এবং নির্ধারিত ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সহজেই সুস্থ হওয়া সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আত্মগোপন না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, এতে জটিলতা এড়ানো যায়।
এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–এর সিলেট বিভাগের সমন্বয়কারী ডা. সুফী মুহাম্মদ খালিদ বলেন—স্কেবিস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ত্বক রোগ, যা সাধারণ চুলকানির মতো দেখালেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে যারা গাদাগাদি পরিবেশে থাকেন কিংবা একই বিছানা, পোশাক ও তোয়ালে ব্যবহার করেন, তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
দুঃখজনক হলো—অনেকেই এটিকে তেমন গুরুত্ব দেন না, ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং পুরো পরিবার আক্রান্ত হয়। হঠাৎ রাতের দিকে তীব্র চুলকানি, ত্বকে ছোট ছোট দানা ও ঘা তৈরি হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন—স্কেবিস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ত্বক রোগ, যা আমরা সাধারণভাবে খোশ-পাচড়া নামে জানি। যদিও এটি প্রথমে সাধারণ চুলকানির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে যারা ঘনবসতি পরিবেশে থাকেন বা একই বিছানা, পোশাক ও তোয়ালে ব্যবহার করেন, তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ডা. নাসির উদ্দিন আরও বলেন—এ ধরনের সংক্রমণ রোধ করতে একই পরিবার বা একই জায়গায় বসবাসকারী সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। এককভাবে চিকিৎসা করলে রোগ পুরোপুরি নির্মূল হবে না এবং পুনঃসংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে। সঠিক চিকিৎসা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলেই দ্রুত সুস্থতা সম্ভব।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন—স্কেবিস একটি সংক্রামক রোগ, যার সংক্রমণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়ায়। বিশেষ করে একই বিছানা, পোশাক বা তোয়ালে ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই ব্যবহৃত জিনিসগুলো গরম পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে; এককভাবে চিকিৎসা করলে রোগ কমবে না। সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ এবং পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চললেই স্কেবিস সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। এছাড়া, পরিবারের সদস্যদের সচেতন রাখা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাও সংক্রমণ রোধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


