“চলমান প্রেক্ষাপট: রাজনীতি না রাতনীতি?”
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন কে ক্ষমতায় আসবে—তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া আসন্ন নির্বাচনের লেবেল ফিল্ড নিয়ে। দিনের আলোতে যে রাজনীতির কথা বলা হয়—সংবিধান, গণতন্ত্র, নির্বাচন, জনগণের অধিকার—রাত নামলেই তার বাস্তবতা কেন ভিন্ন রূপ নেয়? এই দ্বৈততার মাঝেই জন্ম নেয় প্রশ্নটি—এটা কি সত্যিকার অর্থে রাজনীতি, নাকি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত ‘রাতনীতি’?
যেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জনসমক্ষে, সংসদে কিংবা জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে—সেখানে বারবার শোনা যায় রাতের আঁধারে বৈঠক, গোপন সমঝোতা, হঠাৎ সিদ্ধান্ত ও অদৃশ্য নির্দেশনার কথা। ফলে রাজনীতি আর জনগণের প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি থাকে না; বরং হয়ে ওঠে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।
বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ও আলোচিত শব্দগুচ্ছ ছিল—“রাতের ভোট”। বাস্তবতা হলো, টানা প্রায় ১৬ বছর জনগণ কার্যত ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ ও প্রবাস—উভয় জায়গা থেকেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি রাজনীতির ক্রমাগত অধঃপতন। গণতন্ত্রের মৌলিক প্রক্রিয়া যেখানে শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রিত ও অনির্বাচিত ব্যবস্থায়।
একদিকে ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নির্দয় লোভ, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতা-কর্মীর নৈতিক দেউলিয়াত্ব। আদর্শের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে তারা কীভাবে একের পর এক ‘পল্টি’ মেরে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রেখেছেন, তা আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে দল, নীতি কিংবা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা হয়ে উঠেছে গৌণ।
দিনের আলোতে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি, তীব্র স্লোগান আর সরকারবিরোধী অবস্থান—আর রাত নামলেই সেই একই নেতারা গোপনে লিয়াজোঁ করে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। রাজনীতি সেখানে আর সংগ্রামের ভাষা থাকে না; হয়ে ওঠে দরকষাকষির টেবিল।
বিগত সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের নেতার জন্যই প্রবাস ছিল এক ধরনের নিরাপদ রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্র। দিনের আলোতে আমরা দেখেছি—নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সামনে, জ্যাকসনাইট কিংবা জে,এফ,কে এয়ারপোর্টে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর জোরালো প্রতিবাদ কর্মসূচি। স্লোগান, বক্তব্য আর প্রতিরোধের ভাষায় তখন রাজপথ ছিল উত্তপ্ত।
কিন্তু রাত নামলেই দৃশ্যপট বদলে যেত। রাতের অন্ধকারে আমরা আবার দেখেছি—সরকারি মন্ত্রী, এমপি কিংবা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতারা বসছেন বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট কিংবা ব্যক্তিগত বাসায়, সমঝোতার টেবিলে। দিনের প্রকাশ্য প্রতিবাদ আর রাতের গোপন সমন্বয়ের এই দ্বিচারিতাই প্রবাসী রাজনীতিকে পরিণত করেছিল সুবিধাভিত্তিক এক অদৃশ্য মঞ্চে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে—রাজনীতির লড়াই অনেক সময় রাজপথে নয়, বরং নীরব রাতের আড়ালে পরিচালিত হয়।
ফলে রাজনীতির সঙ্গে রাতের অন্ধকারে গড়ে ওঠা সমঝোতার এক অলিখিত নীতি পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মেরুকরণ পরিবর্তন করে। গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জায়গায়, জায়গা করে নিয়েছে লেনদেন, সমন্বয় ও সুবিধাভোগের রাজনীতি। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি বাস্তবে রাজনীতির কথা বলছি, নাকি দীর্ঘদিন ধরেই ‘রাতনীতি’কে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি?
সোশ্যাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে রাজনীতিবিদদের বক্তব্যের নাটকীয় পরিবর্তন। সময়, মঞ্চ ও শ্রোতা ভেদে একই নেতা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতা শাহজাহান সিরাজ, শিশির মনির, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, ফজলুর রহমান দুদু, রুমিন ফারহানা সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক—এদের বক্তব্যে যেমন দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে, এবং রাজনৈতিক দলের অনেক তিব্রত হচ্ছে।
জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক অর্জন আজ আবার বিভাজন ও অনৈক্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ভোটের মাঠে স্বার্থের খাতিরে কখনো ‘একাত্তরের চেতনা’, কখনো ‘২৪-এর চেতনা’ মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ জাতি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে—জামায়াত ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একই সারিতে বসছেন। তখন কি সেই চেতনাগুলোর প্রকৃত উপলব্ধি ও দায়বদ্ধতা আর মনে থাকে?
একদিকে রাজনৈতিক বক্তব্যে অস্পষ্টতা ও পরস্পরবিরোধিতা, অন্যদিকে প্রশাসনের প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব ও নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশের রাজনৈতিক চরিত্র দিনের আলোতে এক রকম, আর রাতের আঁধারে সম্পূর্ণ ভিন্ন রঙ ধারণ করে।
ফলে প্রশ্নটা আর কেবল রাজনৈতিক দল নিয়ে নয়; প্রশ্নটা রাষ্ট্রব্যবস্থার সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট আর ক্ষমতা কিংবা বদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; সংকটটি মূলত আস্থার।
যখন রাজনীতিবিদদের বক্তব্য দিনের আলোতে এক রকম, আর রাতের অন্ধকারে আরেক রকম হয়; যখন রাজপথের উচ্চারণ গোপন সমঝোতায় গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়—তখন জনগণের ভোটাধিকার কেবল অনিশ্চিতই নয়, প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, নীতির দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাভিত্তিক অবস্থান মিলিয়ে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে ‘রাজনীতি’ শব্দটি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ!
এই প্রেক্ষাপটে দেশের সামনে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—আমরা কি দিনের আলোয় জবাবদিহিমূলক রাজনীতির পথে ফিরব, নাকি রাতের আঁধারে পরিচালিত এই ‘রাতনীতি’কেই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা হিসেবে মেনে নেব?
এর উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি নির্ভর করছে জনগণের সচেতনতা, নৈতিক অবস্থান এবং সত্যিকার রাজনৈতিক সংস্কার দাবি করার সাহসের ওপর। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যদি সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান নেতৃত্ব নির্বাচিত করা যায়, তবে অন্ধকার রাতের দুর্গন্ধযুক্ত সমঝোতার রাত-নীতি ভেঙে দিয়ে সুশৃঙ্খল ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখা ও তার বৈধতা নিশ্চিত করতে “হ্যাঁ” ভোটকে বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মিসবাহ আহমদ
কলামিস্ট,নিউইয়র্ক,


