হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক—সিলেটের তরুণদের অকাল মৃত্যুর নতুন আতঙ্ক

হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক—সিলেটের তরুণদের অকাল মৃত্যুর নতুন আতঙ্ক

সুবর্ণা হামিদ

জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর দীপঙ্কর দ্বীপ-যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখো তরুণের অনুপ্রেরণা-গত ১২ নভেম্বর (বুধবার) মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যান। প্রাণচঞ্চল, সৃজনশীল ও পরিশ্রমী এক তরুণের এমন অকাল মৃত্যু শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের নয়, সিলেটের তরুণ সমাজকে গভীর শোক ও আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এত কম বয়সেই হৃদস্পন্দন থেমে যাচ্ছে কেন?

কিন্তু দ্বীপই একমাত্র শিকার নন। গত কয়েক বছরে সিলেটজুড়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তরুণদের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ঘটনা। চিকিৎসকরাও বলছেন, ২০–৩০ বছরের তরুণরা যেভাবে কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন—এটা এখন এক ধরনের নতুন জনস্বাস্থ্য সংকট।

তাহলে প্রশ্ন জাগে অল্প বয়সেই তরুণদের হৃদ্‌যন্ত্র কেন ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছে?
জীবনযাপনে কী এমন পরিবর্তন এসেছে যা বয়সের আগেই তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি—কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তারও বিষয়।

একসময় ধারণা ছিল—হৃদরোগ কেবল মধ্যবয়সী বা বয়স্কদের সমস্যা। কিন্তু এখন বাস্তবতা বদলে গেছে। ১৫–২০, ২৫–৩০ বছর বয়সের তরুণরাও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন—যা পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে।

কিছুদিন আগে সিলেট নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ মফিজ মিয়া ও  তাঁর ভাই মকসুদ মিয়া  হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মর্মান্তিক বিষয় হলো—একই পরিবারের দুই ভাইই অল্প বয়সে, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একইভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

পরিবারের সদস্যরা জানান-দুজনের কোনো বড় শারীরিক অসুখ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্ম করতেন, চলাফেরাতেও ছিলেন সক্রিয়। কিন্তু হঠাৎ করে প্রথমে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, এরপর বড় ভাইয়ের হৃদরোগে মৃত্যু—সবকিছুই তাদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অসহনীয়।

একজন স্বজন বলেন-আমরা ভাবতেই পারিনি এত কম বয়সে একসঙ্গে দুই ভাইকে হারাতে হবে। এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, জাঙ্কফুড ও ফাস্টফুডের প্রতি ঝোঁক, ধূমপান-ভেপিং, এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা—এসব কারণ তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. আব্দুর রউফ মুন্না বলেন-চলতি নভেম্বর মাসে আমাদের কার্ডিওলজি বিভাগে মোট ১,২৩২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২০ বছরের নিচে ২৬ জন এবং ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২৩০ জন রোগী রয়েছেন। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, যার ফলে বিভাগে নিয়মিত চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে কম বয়সীদের মধ্যে হৃদরোগের হার বৃদ্ধি পাওয়াকে আমরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছি। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ, জীবনযাপনে পরিবর্তন ও সচেতনতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন- বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষ দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। হাঁটা–চলার অভাব, সিঁড়ির পরিবর্তে লিফট ব্যবহারের প্রবণতা—এসব মিলিয়ে শারীরিক পরিশ্রম এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

তিনি আরও বলেন-আমরা পর্যালোচনায় দেখছি, জীবনযাপনের এই দ্রুত পরিবর্তন তরুণদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান ও ভেপিং, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়ামের অভাব এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারণে অনেক তরুণ অল্প বয়সেই ঝুঁকিতে পড়ছে। পরিবারের সদস্যদেরও তরুণদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। যেকোনো অস্বাভাবিক শারীরিক লক্ষণকে গুরুত্ব দিলে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলে এ ধরনের অকালমৃত্যু অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (ঢাকা)-এর সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জোবায়ের মিয়া বলেন—মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সরাসরি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়—এ বিষয়টি আমাদের অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অতিরিক্ত উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও বিষণ্নতা শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদস্পন্দন দ্রুত করে এবং হৃদয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এ অবস্থায় থাকলে কম বয়সেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন— হার্ট অ্যাটাক ঝুঁকি কমাতেও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–এর সিলেট বিভাগের সমন্বয়কারী ডা. সুফী মুহাম্মদ খালিদ বলেন-
ইদানিং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ, ধূমপান ও ভেপিং, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘসময় অনলাইন বা স্থির অবস্থায় থাকা—এসব ঝুঁকি কারণ তরুণদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানমুক্ত জীবন—এসব অভ্যাস তরুণদের হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলকে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ এবং প্রয়োজনে সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার আহ্বান জানাচ্ছি |

এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন-হার্ট অ্যাটাকের পেছনে অনেকগুলো কারণ জড়িত। এর মধ্যে আমাদের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, ধূমপান, মানসিক চাপ ও অনিয়মিত জীবনযাপন উল্লেখযোগ্য। এসব কারণের প্রভাবেই সাম্প্রতিক সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। তাছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে বংশগত কারণও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা আমরা চিকিৎসা দিতে গিয়ে প্রায়ই লক্ষ্য করছি

এ বিষয়ে সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন-তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার বাড়তে থাকা আমাদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। আগে যেখানে আমরা মূলত মধ্যবয়সী ও প্রবীণ রোগীদের দেখতাম, এখন ৩০ বছরের নিচের তরুণরাও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে—জীবনযাপনের দ্রুত পরিবর্তন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান ও ভেপিংয়ের ঝোঁক, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি নির্ভরতা, নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার প্রবণতা—এসব মিলিয়েই তরুণ প্রজন্মের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ভয়াবহ হারে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনই সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস কমানো এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অতনু ভট্টাচার্য (বিসিএস-স্বাস্থ্য, এফসিপিএস) বলেন-সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পরিবারের জন্য এটি শুধু শোক নয়—একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ভরসা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি। এ ধরনের অকাল মৃত্যু একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ।
তরুণ বয়সে হৃদরোগের পেছনে যেসব কারণ বেশি দায়ী—তার মধ্যে রয়েছে ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, জাঙ্কফুডের অভ্যাস, অনিয়মিত ঘুম এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপ। এসব কারণে হৃদয়ের রক্তনালী ধীরে ধীরে সংকুচিত হয় এবং একসময় হঠাৎ করেই ব্লক তৈরি করে হার্ট অ্যাটাক ঘটায়। নিয়মিত চেকআপ, স্বাস্থ্যকর খাবার ও ধূমপান ত্যাগ না করলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে।