চিকিৎসা পেশা যেভাবে ইবাদতে পরিণত হয়

চিকিৎসা পেশা যেভাবে ইবাদতে পরিণত হয়

 

 মুফতি সাইফুল ইসলাম

ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিত্সা পেশা একটি সম্মানিত পেশা। এটি পেশা কেবল জীবিকা নির্বাহের একটি উপায়ই নয়, বরং এটি এক ধরনের ইবাদতও বটে। একজন চিকিত্সক যত দক্ষ ও জ্ঞানী হোন না কেন, যদি তার অন্তর পবিত্র ও আচরণ সুন্দর না থাকে, তাহলে রোগীর কাছে তার প্রভাব সীমিত থাকে। তাই চিকিত্সকের জন্য নৈতিক আদব, আন্তরিকতা এবং আল্লাহভীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীচে এমনই কিছু ইসলামী আদব সংকলন করা হলো, যা একজন চিকিত্সককে আরও মানবিক, সতর্ক ও সত্ হতে সাহায্য করবে।

আদব বলতে বুঝানো হয় উত্তম নৈতিক গুণাবলি ধারণ করা। এখানে সেসব শিষ্টাচার ও আচরণ আলোচনা করার চেষ্টা করবো যেগুলো একজন চিকিত্সককে আরও মানবিক করে তুলতে সহায়ক হবে।

এক. অন্তরের পবিত্রতা ও নিয়তের বিশুদ্ধতা : চিকিত্সক যেন তার এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব কামনা করেন। তিনি যেন নিজের খ্যাতি, পারিশ্রমিক বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ না করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভর করে, আর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তা-ই আছে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি হাদিস : ১)
দুই. কাজের নিপুণতা ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা: চিকিত্সক যেন নিজের কাজকে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও যত্ন সহকারে সম্পাদন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা ভালোভাবে করে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৭/৩৪৯)

তিন. আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতা: চিকিত্সক বিশ্বাস রাখবেন যে, তার জ্ঞান ও চিকিত্সা কেবল একটি উপায় মাত্র। সুস্থতা ও নিরাময়ের প্রকৃত মালিক হলেন আল্লাহ তাআলা। তিনি যখন ইচ্ছা করবেন আরোগ্য দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি যখন অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে আরোগ্য দেন। (সুরা শুআরা, আয়াত : ৮০)

চার. তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকা :  চিকিত্সক বিশ্বাস রাখবেন যে, সুস্থতা বা মৃত্যু সবই আল্লাহর হুকুম ও পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ী। ইবন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিছনে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, জেনে রাখো, যদি গোটা মানবজাতি তোমার উপকার করতে চায়, তারা উপকার করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন ততটুকু ছাড়া। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা ক্ষতি করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন শুধু ততটুকুই। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬)
চিকিত্সক কখনোই নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে অহংকার করবে না। ভাববে না যে, সে-ই রোগ নিরাময় করে। 

পাঁচ. ইসলামী শরিয়তের আলোকে চিকিত্সায় উপদেশ দেওয়া : চিকিত্সকের উচিত, রোগীকে কেবল ওষুধ নয়, বরং শরিয়তের আলোকে নিরাময়ের পথেও উত্সাহ দেওয়া। যেমন: আল্লাহর জিকিরে যত্নবান হওয়া, সদকা করা। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) তিনভাবে চিকিত্সা করতেন, (১) প্রাকৃতিক ওষুধ দিয়ে, (২) আল্লাহর দেওয়া ইলাহী চিকিত্সা দ্বারা, (৩) অথবা এই দুইয়ের সমন্বয়ে।’ (জাদুল মা’আদ : ৪/২২)

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন কারো উপর চোখ লাগলে তার জন্য রুকিয়া করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস ৫৭৩৮)

ছয়. চিকিত্সা বিষয়ক পরামর্শের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা :  রোগীর ছুটি প্রয়োজন কিনা, অস্ত্রোপচার জরুরি কিনা, গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা জায়েজ কিনা, কিংবা ডিম্বাশয় অপসারণ করা প্রয়োজন কিনা; ইত্যাদি ক্ষেত্রে চিকিেকর উচিত আল্লাহকে ভয় করে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। কারণ, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে যেন আমানতদার হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২৮)

সাত.  হারাম কিছু দিয়ে চিকিত্সা না করা : আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগও নাজিল করেছেন এবং তার প্রতিকার (ঔষধ)ও দিয়েছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঔষধ রেখেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিত্সা গ্রহণ করো, তবে হারাম জিনিস দিয়ে চিকিত্সা করো না।’ (সহিহুল জামে : ১৬৩৩)

আট. রোগীকে পরীক্ষার বস্তু না বানানো :  রোগীর উপর এমন কোনো ঔষধ বা অপারেশন প্রয়োগ করা যাবে না, যা আগে নিশ্চিতভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি; বিশেষ করে যদি এতে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এটা আল্লাহ কর্তৃক আদম সন্তানকে সম্মানিত করার পরিপন্থী। তবে যদি কোনো ঔষধ প্রয়োগ না করলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেশি হয়, তাহলে কম ক্ষতি বিবেচনায় ঐ ঔষধ প্রয়োগ করা যাবে।

নয়. রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া : ঔষধ লিখে দেওয়ার সময় বা রোগীকে ভর্তি করানো, অপারেশন কিংবা টেস্টের পরামর্শ দেওয়ার সময় রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। এক মুসলমান হিসেবে অপর ভাইকে সাহায্য করা তার দায়িত্ব।

দশ. রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা : রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া তার শরীরের গোপন অঙ্গ দেখার চেষ্টা না করা। যতটুকু অংশ না দেখলেই নয় ততটুকুই শুধু দেখা। 

এগারো. রোগীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা :  রোগীদের সঙ্গে ব্যবহার, ফি নির্ধারণসহ সার্বিক কথাবার্তায় দয়ালু ও নম্র হওয়া উচিত। নবী (সা.) বলেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রফিক (কোমল); তিনি কোমলতা পছন্দ করেন এবং যা কোমলতার মাধ্যমে দেন, তা কঠোরতার মাধ্যমে দেন না (মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৩)

তাই আসুন, আমরা চিকিত্সা পেশাকে শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি এবং রোগীদের প্রতি সদয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করি।

লেখক : প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
Saifpas352@gmail.com